• বৃহস্পতিবার ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

    শিরোনাম

    লকডাউনে ভারতে বেড়েছে পারিবারিক সহিংসতা

    আন্তর্জাতিক ডেস্ক | ০৬ জুন ২০২০ | ৬:২১ অপরাহ্ণ

    লকডাউনে ভারতে বেড়েছে পারিবারিক সহিংসতা

    করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘ লকডাউনের মধ্যে পৃথিবীর অন্য অনেক দেশের মতই ভারতেও বেড়েছে পারিবারিক সহিংসতা।

    গত ১৮ই এপ্রিলের কথা । ভারতে তখন তিন সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে করোনাভাইরাসজনিত লকডাউন চলছে। তারা নামের এক নারী ( তার অনুরোধে এখানে নামটি পরিবর্তন করা হয়েছে) – পারিবারিক সহিংসতার শিকারদের জন্য ভারতে যেসব হেল্পলাইন আছে তার সন্ধান করতে ইন্টারনেটে ঢুকলেন।


    তার বিয়ে হয়েছে ১৫ বছর আগে, এবং তার স্বামী সব সময় তার ওপর নির্যাতন চালাতেন। কখনো মুখের কথায়, কখনো মানসিকভাবে, আর কখনো কখনো শারীরিকভাবে।

    তবে তিনি চাকরি করতেন বলে দিনে একটা বড় সময় তাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। তার স্বামীকেও কাজের সূত্রে নানা জায়গায় যেতে হতো – ফলে অনেক সময় তিনিও বাইরে থাকতেন ।


    কিন্তু ২৫শে মার্চ থেকে শুরু হওয়া লকডাউনের কারণে সব বদলে গেল।

    “কখন-কিভাবে স্বামীর মেজাজ খারাপ হয়ে যায় – এ নিয়ে আমি সব সময়ই একটা ভয়ের মধ্যে থাকি” – আমাকে ফোনে বলছিলেন তারা। এই ফোনটাও তিনি করেছেন ঘরের দরজা বন্ধ করে – যাতে তার স্বামী বা শাশুড়ি কোনভাবে তার কথা শুনে না ফেলেন। তারা বলছেন, স্বামী আর শাশুড়ি দুজনেই তাকে বিদ্রূপ আর হয়রানি করেন।


    ‍“আমাকে সব সময় বলা হয়, আমি ভালো মা নই, ভালো স্ত্রী নই। তারা আমাকে অনেক পদ রান্না করে খাওয়াতে বলে, আমার সাথে ঘরের চাকরানির মতো আচরণ করে।‍“

    এই নিপীড়ন আর মারধর সহ্য করতে না পেরে অনলাইনে সাহায্য নেবার সিদ্ধান্ত নিলেন তারা।

    তিনি একটি ফেসবুক পাতার সন্ধান পেলেন যা চালায় ‘ইনভিজিবল স্কারস’ বা অদৃশ্য ক্ষতচিহ্ন নামের একটি সহায়তাকারী সংগঠন – এবং তাদের সাথে যোগাযোগ করলেন।

    ‍“আমরা এরকম বহু অভিযোগ পাচ্ছি অনেকের কাছ থেকে এবং তারা আমাদের সাহায্য চাইছেন” – বললেন সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা একতা বিবেক ভার্মা, যার সাথে তারার কথা হয়।

    মিজ ভার্মা বললেন, তাদের পক্ষ থেকে তারাকে সব রকম বিকল্প বুঝিয়ে বলা হয়েছে – যার মধ্যে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করা, আইনসম্মত ভাবে আলাদা থাকা, বা তার স্বামীর সাথে কথা বলে তার মানসিক পরামর্শের ব্যবস্থা করা। তারা বলছেন, তিনি তার স্বামীকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে তিনি পুলিশে অভিযোগ করবেন। তখন কিছুদিনের জন্য নির্যাতন বন্ধ ছিল। কিন্তু তার পর আবার তার শুরু হলো আগের মতোই।

    তারা বলছেন, স্বামীর ঘর ছেড়ে আলাদা থাকার বিকল্পটি তার জন্য সম্ভব নয়।

    তিনি বলছেন, “শুধু উপরওয়ালাই আমাকে রক্ষা করতে পারেন। আমি আমার বাবা-মা এবং আমার শিশু সন্তানকে কোন সমস্যায় ফেলতে চাই না।“

    লকডাউনে অভিযোগের পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে

    মিজ ভার্মা বলছেন, বেশির ভাগ সময়ই একজন নারী তার নিপীড়ক স্বামীকে ছাড়তে চায় না। বরং এই নারীরা চায় – কীভাবে স্বামীকে একটা শিক্ষা দেয়া যায়, বা কীভাবে তাদেরকে স্ত্রীর প্রতি ভালো আচরণ করতে বাধ্য করা যায়। এর কারণ হলো, কোন মেয়ে যদি নির্যাতনের কারণে বিয়ে ভেঙে দিতে চায় তাহলে খুব কম পরিবারই তা সমর্থন করে – বিশেষ করে যদি সেই মেযেটির সন্তান থাকে। তারার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে।

    বিশেষ করে লকডাউনের কারণে যখন যানবাহন চলাচল খুবই সীমিত, তখন স্বামীকে ছেড়ে কোন আশ্রয়ে গিয়ে থাকা, বা বাবা-মায়ের সাথে থাকা অত্যন্ত কঠিন। ভারতে ২০১৮ সালে নারীর বিরুদ্ধে যত অপরাধ পুলিশের তালিকাভুক্ত হয়েছে –তার মধ্যে ৩২ শতাংশ বা এক তৃতীয়াংশই হচ্ছে “স্বামী বা তার আত্মীয়স্বজনদের নিষ্ঠুরতা।“ পুলিশ ২০১৮ সালে এমন ১ লক্ষ ৩ হাজার ২৭২টি কেস নিবন্ধন করেছে।

    ভারতের একটি সরকারি জরিপ আছে যার নাম ‘জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য জরিপ’ । ২০১৫-১৬ সালে এই জরিপে দেখা যায় প্রায় ৩৩ শতাংশ নারীই স্বামীর দ্বারা শারীরিক বা মানসিক সহিংসতার শিকার হয়েছে।

    এতে আরো দেখা যায় যে সহিংসতার শিকার হওয়া নারীদের মাত্র ১৪ শতাংশ এমন আচরণ থামানোর জন্য কোন রকম সহায়তা নিয়েছেন। তা সত্বেও ভারতের নারী বিষয়ক জাতীয় কমিশন বলছে, তারা লকডাউনের সময় অভিযোগের সংখ্যায় উর্ধ্বগতি লক্ষ্য করেছেন। কমিশনের চেয়ারপারসন রেখা শর্মা বিবিসিকে একথা বলেছেন। এই বৃদ্ধি এতটাই ছিল যে লকডাউনের সময় মহিলাদের সাহায্য করতে হোয়াটসএ্যাপে একটি হেল্পলাইন চালু করেন। হোয়াটসএ্যাপ ভারতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, এবং যে মহিলারা কেউ শুনে ফেলবে এই ভয়ে ফোন করতে পারে না তাদের জন্য একটি নিরাপদ বিকল্প।

    এ বছর ২৩শে মার্চ থেকে শুরু করে ১৬ই এপ্রিল পর্যন্ত – যাকে বলা যায় লকডাউনের মোটামুটি প্রথম তিন সপ্তাহ – পারিবারিক সহিংসতার ২৩৯টি অভিযোগ পায় কমিশন। লকডাউনের আগে এক মাসে যেখানে তারা ১২৩টি অভিযোগ পেয়েছিল – সে হিসেবে এ সংখ্যা অনেকটা বেশি।

    “‍লকডাউনের বিধিনিষেধের কারণে নির্যাতনকারী হতাশ এবং ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে কারণ তার মনে হয় সে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে” – বলেন অধ্যাপক অশ্বিনী দেশপাণ্ডে, দিল্লির অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অর্থনীতিবিদ।

    ‍“এর ফলে সে নির্যাতনের মাধ্যমে তার সঙ্গী বা সন্তানদের ওপর আরো বেশি করে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে উদ্বুদ্ধ হয়” – বলেন তিনি।

    মিজ দেশপাণ্ডে ২০২০ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে কমিশনের পাওয়া অভিযোগগুলোর সাথে গত বছরের একই সময় পাওয়া অভিযোগগুলো তুলনা করেছেন। তিনি দেখেছেন যে গত বছর তারা গড়ে প্রতিদিন পাঁচটি অভিযোগ পেতেন, কিন্তু এ বছর পেয়েছেন গড়ে প্রতিদিন নয়টি অভিযোগ।

    এটা যে শুধু ভারতেই ঘটেছে তা নয়। এপ্রিল মাসের প্রথম দিকে জাতিসংঘের মহাসচিব এ্যান্টোনিও গুটেরেস বলেছিলেন, লকডাউনের মধ্যে বিশ্বব্যাপী পারিবারিক সহিংসতা ভীতিকর রকমে বেড়ে গেছে।

    জাতিসংঘ বলছে, লেবানন ও মালয়েশিয়ায় সে সময় হেল্পলাইনে ফোনের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ বেড়ে যায়। চীনে তা বেড়ে যায় তিন গুণ।

    ভারতে পারিবারিক সহিংসতা থেকে বেঁচে যাওয়াদের জন্য একটি হেলপলাইন চালায় স্নেহা নামে একটি সংগঠন। এর কর্মকর্তা নায়রিন দারুওয়ালা বলেন, ভারতের মত দেশে নারদের পক্ষে তার অভিযোগ নিয়ে রিপোর্ট করা সহজ নয়। এ সংগঠনটি বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিখ্যাত ব্যক্তিদেরকে তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি ও অর্থসংগ্রহের কর্মসূচির সাথে জড়িত করেছে। সূত্র: বিবিসি

    Facebook Comments

    বাংলাদেশ সময়: ৬:২১ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৬ জুন ২০২০

    qaominews.com |

    advertisement

    এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

    advertisement
    শনিরবিসোমমঙ্গলবুধবৃহশুক্র
     
    ১০১১১২১৩
    ১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
    ২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
    ২৮২৯৩০ 
    advertisement

    Editor : A K M Ashraful Hoque

    51.51/A,, Resourceful Paltal City, Purana Paltan, Dhaka-1000
    E-mail : qaominews@gmail.com

    ©- 2020 qaominews.com all rights reserved