প্রচ্ছদ ধর্ম-দর্শন

মানবতা রক্ষায় দরকার বিবেকের জাগরণ

শাহীন হাসনাত | শুক্রবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 810 বার

মানবতা রক্ষায় দরকার বিবেকের জাগরণ

মিয়ানমারে আসলে কী হচ্ছে—তা বাইরের দুনিয়া থেকে বলা মুশকিল। কারণ, বিশ্ব মিডিয়া রাখাইন রাজ্যে প্রবেশ করতে পারে না। তবে সে দেশের সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গাদের ওপর ব্যাপক দমন-পীড়নের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে। চলমান সহিংসতার তীব্রতা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু রোহিঙ্গা নিপীড়ন করতে গিয়ে মানবতাবিরোধী যত প্রকার অপরাধ এর সবটাই করছে বলে অভিযোগ উঠেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। আমরা মনে করি, জঙ্গি বা সন্ত্রাসী দমনের নামে একজন সাধারণ মানুষও যদি নিহত হয়, সেটাও ঘোর অন্যায় এবং মানবাধিকারের ঘোর লঙ্ঘন। এমনকি কোনো দেশে অবস্থান নেওয়া কোনো অবৈধ ব্যক্তিকেও হত্যা করা যায় না।

মিয়ানমার স্বীকার করুক বা না-ই করুক, রোহিঙ্গারা ঐতিহাসিকভাবে সে দেশের অধিবাসী। অধিবাসী না হলেও হত্যা কিংবা নির্যাতন করা যাবে না। রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয় মানছি, তাই বলে তাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারে না। বিশেষ করে জাতিসংঘকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আরো সোচ্চার এবং দৃশ্যমান ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশ্বময় মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে আরো জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে। কিন্তু রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের ওপর যতটা আন্তর্জাতিক অনুরোধ এবং চাপ আছে; ততটা মিয়ানমারের ওপর আছে বলে মনে হয় না। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যাটি অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও রোহিঙ্গা নির্যাতন বিষয়টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের। বিষয়টি শুধু ধর্মের নয়, মানবতারও।

মিয়ানমারে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং প্রতিবাদ জানানোর দায়িত্ব কেবল শুধু বাংলাদেশের কিংবা মুসলমানদের নয়; এটা সমগ্র বিশ্ব নেতৃত্ব ও বিশ্ববাসীর নৈতিক দায়িত্ব। মুসলিম নির্যাতিত হলে আরব বিশ্ব, অমুসলিম নির্যাতিত হলে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান বিশ্বকে সোচ্চার হতে হবে—এমন সংকীর্ণ ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব থেকে বেরিয়ে এসে সাম্প্রদায়িক আস্ফালন পৃথিবীর যে প্রান্তেই দেখা যাবে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে বিশ্ববাসীকে এর বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে।

আমরা জানি, পৃথিবীতে মানবাধিকারকে সমুন্নত রাখার জন্য গড়ে উঠেছে বহুসংখ্যক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থা। এসব সংগঠন মানবাধিকারের স্বীকৃতি ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রচুর শ্রম ও সময় ব্যয় করে থাকে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে উল্লেখ করতে হয়—গড়ে ওঠা এসব সংস্থার কথা খুব কমই পরোয়া করা হয়। বলদর্পী স্বৈরশাসকরা এসব সংস্থাকে পাশ কাটিয়ে মিডিয়ার সাহায্য নিয়ে নিজেদের আড়াল করতে সক্ষম হয়। একদিকে এসব সংগঠন এতটাই দুর্বল যে বিশ্ব মিডিয়া তাদের কখনো কভারেজ করে না। অন্যদিকে অত্যাচারী স্বৈরশাসকদের নির্লজ্জ স্বভাব হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক আইন-কানুন ও সৌজন্যতাকে পরোয়া করে না। আবার অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোনো সংগঠন এসব স্বৈরশাসকদের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে মানবসভ্যতা বারবার অত্যাচার, নির্যাতন, শোষণ-বঞ্চনা, অবজ্ঞা ও অবহেলার নির্মম শিকার হয়।

মানবাধিকার অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর একটি বিষয়। এটি বিশ্ব বিবেকের কাজ। বিবেকের তাড়নায় মানবিক মূল্যবোধ ও মনুষ্যত্ব যখন জেগে ওঠে, তখন মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করেন। যেহেতু মানবজাতি আবহমানকাল ধরে নানা রকম অত্যাচার, নির্যাতন, শোষণ, বঞ্চনা, অবজ্ঞা ও অবহেলার নির্মম শিকার এবং এসব অত্যাচার, নির্যাতন ও শোষণ-বঞ্চনা ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রগত সর্বক্ষেত্রেই ভোগ করছে, সেহেতু বিশ্ব বিবেকের কাছে মানবাধিকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তার মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনে মানবাধিকারের উদ্ভব হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মানুষের মনুষ্যত্ব, তার সম্মান ও মর্যাদা, তার সদাচরণ ও সম্মানজনক জীবনযাপনের অধিকারকে ‘মানবাধিকার’ বলে। পরবর্তী ধাপে মানুষের চিন্তা, মতামত ও ভোটের অধিকার, নাগরিক অধিকার, ভ্রমণের অধিকার ও বসবাসের অধিকার এর অন্তর্ভুক্ত। আমরা আশ্চর্যের সঙ্গে লক্ষ করছি যে, মানুষের এসব অধিকারকে সমুন্নত রাখার জন্য বর্তমানের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো যতটুকু গুরুত্ব ও পর্যালোচনায় আত্মনিয়োগ করেছে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের হার তার চেয়েও বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকারের প্রতি অসম্মানের দরুণ মানবতা আজ বিপন্ন।

অনেকেই দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু এ অভিযোগ অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। জাতীয় বা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইসলাম ও মুসলমানদের মানবাধিকার সম্পর্কিত বিষয়ে, তাদের অধিকার বঞ্চনের ক্ষেত্রে তাদের পক্ষে তেমন একটা সোচ্চার হতে দেখা যায় না। এটি একটি নৈতিক পরাজয়।

অথচ মানবিকতা ও মানবাধিকার বিষয়ে ইসলামের ভূমিকাই অধিক সুপ্রাচীন। কালের আবর্তে তারাই আজ মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। মানবাধিকারের মূল কোরআনে কারিম ও হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস থেকে উৎসারিত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘মানুষ খারাপ কথা বলে বেড়াক, তা আল্লাহ পছন্দ করেন না। তবে কারো জুলুম করা হলে তার কথা স্বতন্ত্র। আর আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন।’ —সূরা নিসা : ১৪৮

কোরআনে কারিমে আরো বলা হয়েছে, ‘মুমিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমাদের ভাইদের মধ্যকার সম্পর্ক ঠিক করে দাও। আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমাদের প্রতি মেহেরবাণী করা হবে।’ —সূরা হুজরাত : ১০

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপর মুসলমানের জান, মাল ও ইজ্জত হারাম।’ —সহিহ মুসলিম

হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, হজরত নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। সে তার ওপর জুলুম করে না, তাকে সহযোগিতা করা পরিত্যাগ করে না এবং তাকে লাঞ্ছিত ও হেয় করে না। কোনো ব্যক্তির জন্য তার কোনো মুসলমান ভাইকে হেয় ও ক্ষুদ্র জ্ঞান করার মতো অপকর্ম আর নেই।’ —মুসনাদে আহমাদ

হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘মুসলিম সে, যার ভাষা ও কর্ম থেকে মুসলমানরা নিরাপদ থাকে।’ —সহিহ বোখারি

উল্লিখিত আয়াত ও রাসুল (সা.)-এর বাণীগুলো নিবিষ্ট মনে অবলোকন করুন, দেখুন মানবাধিকারের মূল কোত্থেকে উৎসারিত। তা ছাড়া রাসুলের বিদায় হজের ভাষণ ও মদিনা সনদ মানবাধিকারের সর্বোচ্চ শিখরে আজো জ্বলজ্বল করছে। তাই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাকে নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর দিকে দৃষ্টিপাত করতে বলব। যেসব এলাকায় মানবতা আজ বিপন্ন। তাদের ব্যাপারে সোচ্চার হওয়া আপনাদের নৈতিক দায়িত্ব ও বিবেকের তাড়না। হীনষ্মন্যতা ও পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি যেন কখনো পেয়ে না বসে। যদি এমনটি হয়, তবে তা হবে বিবেকের সঙ্গে বিশাল প্রতারণা। এমন প্রতারণা যুগ যুগ ধরে চলতে পারে না। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তের ঘূর্ণাবর্তে পড়ে মানবাধিকারের সঠিক পরিচয় হারিয়ে যাক, এটা হতে দেওয়া যায় না। তাই আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, ধর্মের ভিত্তিতে নয়, মানবতার ডাকে, মানবতার স্বার্থে, মিয়ানমারসহ বিশ্বের নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর পাশে বিশ্ববাসী সহায়তার হাত সম্প্রসারণ করবে। যাবতীয় অত্যাচার-নিপীড়নের বিরুদ্ধে শান্তির বাণী নিয়ে কাজ করবে; যা এ মুহূর্তের জন্য বেশি দরকারি বিষয়।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

qaominews.com/কওমীনিউজ/এএম

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ