প্রচ্ছদ সাক্ষাৎকার, স্লাইডার

দুষ্টচক্রের কবলে বেফাক: কওমী অঙ্গনে হতাশা

স্টাফ রিপোর্টার | মঙ্গলবার, ০৪ অক্টোবর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 5524 বার

দুষ্টচক্রের কবলে বেফাক: কওমী অঙ্গনে হতাশা

বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড (বেফাক)-এর লোগো

‘বগলে ইট মুখে শেখ ফরিদ’ নীতির ফলে ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানটি এখন ধ্বংসের পথে। স্বীকৃতির বিষয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মত প্রকাশ করে বেফাক চরম বেকায়দায় পড়েছে। দেশব্যাপী বেফাকভুক্ত মাদরাসার মুহতামিম, শিক্ষকমণ্ডলী ও ছাত্রসমাজ এখন আর বেফাকের ভূমিকার উপর আস্থা রাখতে পারছে না। সোমবার কওমীনিউজের সঙ্গে আলাপকালে বেফাকের এক শীর্ষ মুরব্বি এসব কথা বলেন।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এই শায়খুল হাদিস ও মুহতামিম দীর্ঘদিন ধরে বেফাকের কাজকর্ম থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। তবে এই মুহূর্তে নামপ্রকাশ না করলেও সহসাই তিনি সংবাদ সম্মেলন করে বেফাক রক্ষায় ডাক দেবেন বলে জানান।

তার এই দূরত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে জবাবে তিনি বলেন, বেফাক এখন একটি গোষ্ঠির দখলে। জমিয়তের ত্যাগী কর্মী ও পরীক্ষিত নেতাদের ডিঙিয়ে যে দুষ্টচক্র জমিয়তের দখল নিয়েছে সেটিই আবার কৌশলে সার্বজনীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান বেফাককেও কুক্ষিগত করে ফেলেছে। যার ফলে বেফাক এখন একটি লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। লাখো কওমী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কষ্টের টাকায় গড়ে ওঠা বেফাকের মোটা তহবিল খরচ হচ্ছে দুষ্টচক্রের খানাপিনা ও বিলাসিতায়।

তার এই উষ্মার মূল কারণ জানতে চাইলে কওমীনিউজকে বলেন, বেফাকের প্রায় দুইশত শুরা ও আমেলার সদস্যকে না জানিয়ে বারিধারা মাদরাসার গোপন কক্ষে বেফাকের সব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমীর ইচ্ছে অনুযায়ী মহাসচিব চলতে বাধ্য হচ্ছেন। কাসেমীর লোকজনের চোখ রাঙানির ভয়ে মহাসচিব স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। কাসেমীর ইচ্ছায় তাকে রোগী সেজে হাসপাতালে যেতে হয়। পুতুল নাচের মতো সতোর টানে নড়াচড়া করতে হয়। এখন তিনি বেফাকে তার অফিসে বসে অতীত মুরব্বিদের গালমন্দও করেন! সিনিয়র সহসভাপতি আল্লামা আশরাফ আলী ও আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহকে রাজাকার আখ্যায়িত করে তিনি দর্শনার্থীদের সামনে বক্তব্য দেন। আল্লামা মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা, পত্রিকায় নিউজ ছাপা এবং তার সমালোচনা করে বেফাকের খরচে বই রচনা ও বিতরণ করেন। মহাসচিব তার সংকীর্ণ রাজনীতির জন্য ইত্যোমধ্যেই বেফাকের নবীন-প্রবীণ নেতৃবৃন্দের আস্থা-বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা হারিয়েছেন। তার ব্যাপারে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ না থাকলেও দুষ্টচক্রের কাজে সমর্থন ও সহযোগী হওয়ায় ভবিষ্যতে তিনিও এসবের দায় এড়াতে পারবেন বলে মনে হয় না। বেফাকের নিয়োগ, নির্মাণ, ক্রয়, প্রকাশনা মুদ্রণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস, সফর ও আপ্যায়নে যে মারাত্মক ফাঁকফোকর তথা দুর্নীতি রয়ে যাচ্ছে দুদক তদন্ত করলে এর সবই জাতি জানতে পারবে। বেফাকের সরলপ্রাণ মুরব্বিগণ ও সারাদেশের শুরা-আমেলার সদস্যদের চোখ ফাঁকি দেয়া সম্ভব হলেও সরকারের অনুসন্ধানী দৃষ্টিকে তারা ফাঁকি দিতে পারবে না। ইতোমধ্যে বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও তদন্ত কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে কাজ শুরু করেছে বলে জানা গেছে। দরিদ্র মাদরাসাগুলোর চাঁদা, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কষ্টের টাকা নিয়ে যাচ্ছেতাই করার জবাব আল্লাহর দরবারে তো দিতে হবেই। বেফাকের পূর্ণাঙ্গ কমিটির মাধ্যমে জাতির সামনেও তাদের জবাবদিহি করতে হবে। এ ব্যাপারে খোঁজ নেয়া বেফাকের সকল মুরব্বির ঈমানি দায়িত্ব।


কওমী অঙ্গনের ঐক্য গড়তে বেফাক ব্যর্থ হয়েছে। এ অঙ্গনের নেতৃত্ব দিতেও কওমী মাদরাসা শিক্ষাবোর্ডকে সফল হতে দেয়নি এই দুষ্টচক্র। আগামী দিনে দেশ জাতি কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবকদের আস্থা হারিয়ে বেফাক কেবল বারিধারার একটি শাখা অফিস  হিসেবেই রয়ে যাবে।


এসব বিষয় তার নিজস্ব অভিযোগ না দেশের আরো আলেম এ নিয়ে ভাবছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে আলোচ্য মুরব্বি বলেন, উত্তরবঙ্গের তানযীম, পটিয়ার ইত্তেহাদুল মাদারিস, সিলেটের এদারা, গওহরডাঙ্গার বেফাক প্রতিষ্ঠানগুলো বেফাকের সঙ্গে একসাথে কাজ করতে চাইলেও কেনো তাদের সে সুযোগ দেয়া হয়নি। আমেলার মিটিংয়ে নেয়া সিদ্ধান্ত কেনো বাস্তবায়িত হয় না। চার বোর্ড, বড়ো বড়ো মাদরাসা ও বিশিষ্ট আলেমদের বেফাকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও কেনো তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ঢাকার ভেতর মাওলানা হিফজুর রহমান, মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী, মুফতি মনসুরুল হক, মারকাযের মাওলানা আবুল হাসান আবদুল্লাহ, মুফতি আবদুল মালেক, মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম (চরমোনাই পীর), মাওলানা আতাউল্লাহ হাফেজ্জি, মুফতি জাফর আহমদ (ঢালকানগর), মাওলানা আবু তাহের জিহাদী, মাওলানা সালমান (দারুর রাশাদ), মাওলানা আবুল হাসানাত আমিনী কেনো বেফাকে নেই? যাদের ত্যাগ ও সাধনায় বেফাক গড়ে উঠেছিলো যেমন—হাজি ইউনুস রহ., মাওলানা আতাউর রহমান খান রহ, মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী রহ. তাদের যোগ্য উত্তসূরিরা কেউই কেনো বেফাকে নেই। বর্তমান মুরব্বিদের মধ্যেও মাওলানা আশরাফ আলী, মাওলানা আবদুল হামিদ (মধুপুরের পীর), মাওলানা আনোয়ার শাহ, মাওলানা আবদুল কুদ্দুস, প্রিন্সিপাল মাওলানা হাবীবুর রহমান, মাওলানা আবদুর রহমান হাফেজ্জিসহ অনেক মুরব্বিই বেফাকে নামমাত্র রয়েছেন। তাদের কোনো ভূমিকা ও মূল্যায়নের সুযোগ রাখা হয়নি কেনো। বারবার কমিটির সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও মাওলানা মাহমুদুল হাসানকে বেফাকে নেয়া হয় না কেনো? মাওলানা নূর হোসেন কাসেমী তার দলবল নিয়ে কারণে-অকারণে বেফাকে খানাপিনা, আসাযাওয়া এবং গাড়ি ও বিমানে  সারাদেশে ঘুরে বেড়ান কোন ক্ষমতাবলে। এসব প্রশ্ন এখন বেফাক সদস্য ও কর্মকর্তাদের মুখে মুখে। সারাদেশে শিক্ষার্থী পর্যায়েও এসব কথা ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু দুষ্টচক্রটির লাগাম টেনে ধরার যেন কেউ নেই। বেফাক সদস্য ও কর্মকর্তাদের অধিকাংশই অন্তরে এর ক্ষোভ ও দুঃখ নিয়ে নিস্ক্রীয় হয়ে আছেন।


বেফাকের প্রায় দুইশত শুরা ও আমেলার সদস্যকে না জানিয়ে বারিধারা মাদরাসার গোপন কক্ষে বেফাকের সব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমীর ইচ্ছে অনুযায়ী সহাসচিব চলতে বাধ্য হচ্ছেন। কাসেমীর লোকজনের চোখ রাঙানির ভয়ে মহাসচিব স্বাধীনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। কাসেমীর ইচ্ছায় তাকে রোগী সেজে হাসপাতালে যেতে হয়। পুতুল নাচের মতো সুতোর টানে নড়াচড়া করতে হয়। এখন তিনি বেফাকে তার অফিসে বসে অতীত মুরব্বিদের গালমন্দও করেন!


স্বীকৃতির বিষয়ে এক কথায় না থেকে নানা সময় নানা মুখে নানা কথা বলে এখন বেফাককে বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে এই দুষ্টচক্র। এদের কারণে আজ সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব আল্লামা আহমদ শফীও বিতর্কিত হয়ে পড়ছেন। তার আহ্বানে দেশের কোনো বোর্ডই সাড়া দিচ্ছে না। সরকারও ভিন্ন মাধ্যমে কওমী অঙ্গনে যোগাযোগ করছে। অথচ বেফাকই ছিলো এর যোগ্য প্রতিষ্ঠান। আল্লামা শফীই ছিলেন কওমী অঙ্গনের অবিসংবাদিত নেতা। দুষ্টচক্র তাদের সংকীর্ণ মানসিকতা, দখলদারি মন, হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যে জাতীয় প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। কওমী অঙ্গনের ঐক্য গড়তে বেফাক ব্যর্থ হয়েছে। এ অঙ্গনের নেতৃত্ব দিতেও বেফাককে সফল হতে দেয়নি এই দুষ্টচক্র। আগামী দিনে দেশ জাতি কওমী মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক ও অভিভাবকদের আস্থা হারিয়ে বেফাক কেবল বারিধারার একটি শাখা অফিস হিসেবেই রয়ে যাবে। মাদরাসার চাঁদা ও গরিব শিক্ষার্থীদের ফিস বই কেনা ইত্যাদির টাকায় গড়ে উঠা কোটি কোটি টাকার তহবিল ইচ্ছেমতো খরচ করার জন্য শুধু ওই দুষ্টচক্রটি বেফাককে ঘিরে ঘুরঘুর করতে থাকবে। কাজের কাজ কিছুই হবে না।

qaominews.com/কওমীনিউজ/এম

আরো পড়ুন

বেফাকে সিন্ডিকেটভিত্তিক লোক নিয়োগ: অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ

 

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ