প্রচ্ছদ মনীষী জীবন, স্লাইডার

ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর: ইসলামের নিবেদিত প্রাণ

আবদুল মতিন | বুধবার, ১৮ মে ২০১৬ | পড়া হয়েছে 3668 বার

ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর: ইসলামের নিবেদিত প্রাণ

ড. আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর

অধ্যাপক ডক্টর খোন্দকার আবু নাঈম মোহাম্মদ আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর ছিলেন দেশের এক বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রিয় ‘শাইখ’, দ্বীনের মহান শিক্ষক। তিনি ছিলেন একাধারে ইসলামী চিন্তাবিদ, টিভি আলোচক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিস বিভাগের অধ্যাপক, বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন, গবেষক ও লেখক। তিনি পিস টিভি, ইসলামিক টিভি, এটিএন ও এনটিভি, চ্যানেল নাইনসহ বিভিন্ন টিভিতে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ইসলামের সঠিক সমাধান তুলে ধরতেন। বিদেশী টেলিভিশন চ্যানেল আইটিভি ইউএস-এর উপদেষ্টা ছিলেন।

এছাড়াও তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সিম্পোজিয়াম, সেমিনার, মসজিদের খুতবা ও টিভি আলোচনায় খ্রিস্টান মিশনারিদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে দেশের সহজ-সরল মুসলমানদের ধর্মান্তরিত হওয়ার বিষয়গুলো আলোচনা করে জনসচেতনতা তৈরি করে আসছিলেন। বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে বিস্তারিত উত্তর প্রদানে পারদর্শিতাই তার জ্ঞানের গভীরতার উজ্জল দৃষ্টান্ত। সম্প্রতি আস-সুন্নাহ ট্রাস্টের অধীনে একটি মিডিয়া স্টুডিও প্রতিষ্ঠা করেছেন, যেখান থেকে দ্বীনের দাওয়াহর কাজ করার একান্ত বাসনা তিনি পোষণ করতেন। আসন্ন রমজানের জন্য কিছু অনুষ্ঠান রেকর্ড করেছেন এবং বাকিগুলোর কাজ চলছিল। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের ডাকে সাড়া দিয়ে কান্তিহীনভাবে দৌড়েছেন এক স্থান থেকে আরেক স্থানে, দ্বীনের কথা বলতে, মানুষকে জান্নাতের পথে আহ্বান করতে। দারুস সালাম কওমী মাদরাসা, ঢাকা, পাকশী কওমী মাদরাসায় (পাবনা) বুখারী শরীফের দারস দিতে ছুটে যেতেন তিনি।

এই বরেণ্য ব্যক্তিত্বের জন্ম হয় ১৯৬১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ঝিনাইদহের ধোপাঘাট গোবিন্দপুর গ্রামে। তার পিতা খোন্দকার আনওয়ারুজ্জামান ও মা বেগম লুৎফুন্নাহার। তিনি ১৯৭৩ সালে সরকারী মাদরাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা থেকে দাখিল পাশ করেন। এরপর একই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৭৫ সালে আলিম এবং ১৯৭৭ সালে ফাজিল ও ১৯৭৯ সালে হাদিস বিভাগ থেকে কামিল পাস করেন। তারপর উচ্চতর শিক্ষার জন্যে সৌদিআরব গমন করেন। রিয়াদে অবস্থিত ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৮৬ সালে অনার্স, ১৯৯২ সালে মাস্টার্স ও ১৯৯৮ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। অত্যন্ত মেধাবী মানুষটি কুরআনে হাফেজও ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া ড. আব্দুস সালাম আযাদীর ভাষ্যমতে, “বিদেশিদের মাঝে তিনি ইসলামের দাওয়াত প্রচার করতেন। ইংরেজিতে খুব ভালো ছিলেন বলে আমেরিকান সেনা ছাউনিতে তিনি ইসলাম পৌঁছানোর কাজ করতেন। ড. জগলুল নাজ্জার ও জাহাঙ্গীর স্যারের দাওয়াতে তিন শতাধিক সৈন্য ইসলাম গ্রহণ করে।”

ছাত্রজীবনে অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। রিয়াদের মুহাম্মাদ বিন সাঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি বর্তমান সৌদি বাদশা ও তৎকালীন রিয়াদের গভর্নর সালমান বিন আব্দুল আজিজের হাত থেকে পর পর দু’বার সেরা ছাত্রের পুরস্কার গ্রহণ করেন। এ সময় তিনি শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায, সালেহ বিন উসায়মিন, আল জিবরিন ও আল ফাউজানের মতো বিশ্ববরেণ্য স্কলারদের সান্নিধ্য লাভে সক্ষম হন। লেখাপড়ার পাশাপাশি ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি উত্তর রিয়াদ ইসলামী সেন্টারে দাঈ ও অনুবাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

লেখাপড়া শেষ করে দেশে ফিরে ১৯৯৮ সালে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদীস অ্যান্ড ইসলামী স্টাডিজ বিভাগের লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৯ সালে তিনি ইন্দোনেশিয়া থেকে ইসলামী উন্নয়ন ও আরবী ভাষা বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ২০০৯ সালে তিনি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে প্রফেসর পদে উন্নীত হন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকার দারুস সালাম মাদরাসায় খণ্ডকালীন শায়খুল হাদীস হিসেবেও পাঠদান করতেন। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে তার ইংরেজি, বাংলা ও আরবী ভাষায় প্রায় ৩০টি মৌলিক গ্রন্থ এবং ৪০টির বেশি গবেষণা প্রবন্ধ দেশে-বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ইংরেজি ভাষায় A Woman From Desert (1995), Guidance For Fasting Muslims (1997), A Summary of Three Fundamentals of Islam (1997); আরবি ভাষায় লিখিত আদাবুল হাদীস’ (২০০৭); বাংলায় উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো: হাদীসের নামে জালিয়াতি, এহ্ইয়াউস সুনান ও কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা, রাহে বেলায়েত, রোযা, ইসলামের তিন মূলনীতি, একজন জাপানি নারীর দৃষ্টিতে হিজাব, কোরআন সুন্নাহর আলোকে পোশাক, পর্দা ও দেহ-সজ্জা, বাংলাদেশে উশর বা ফসলের যাকাত গুরুত্ব ও প্রয়োগ, ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ, খুতবাতুল ইসলামসহ অনেক মুল্যবান গ্রন্থ। তাছাড়া তিনি মুসনাদে আহমাদ, ইমাম আবু হানিফা রাহঃ রচিত আল-ফিকহুল আকবার এবং ইযহারুল হকসহ বেশ কয়েকটি গ্রন্থ অনুবাদ করেছেন।

ড. আবদুল্লাহ ব্যক্তিজীবনে ছিলেন অত্যন্ত সদালাপী, যুগ সচেতন এবং মুসলিম উম্মাহর ঐক্যবিধানে তৎপর ছিলেন। নিরহঙ্কার, সদালাপী সব্যসাচী মানুষটি দুনিয়া থেকে নিয়ে গেছেন অনেক বেশি। তাহলো উম্মাহর জন্য এই জ্ঞানসাধকের নিরলস পরিশ্রমের পাওনা, দ্বীনের পথে আহ্বানকারী হিসেবে পেরেশানির মহান পুরস্কার, হাজারো মানুষের ভালোবাসা, সর্বোপরি আল্লাহর মহান সন্তুষ্টি। সমাজের উন্নয়নে ঝিনাইদহ শহরের গোবিন্দপুরে আল ফারুক একাডেমি ও আস সুন্নাহ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করেন এ বরেণ্য এই ইসলামী ব্যক্তিত্ব। সেখানে ছেলে-মেয়েদের হেফজখানা প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাতা ও মহাসচিব হিসেবে কাজ করেছেন শিক্ষা ও ঝিনাইদহের চ্যারিটি ফাউন্ডেশনে, প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইনস্টিটিউটের। আজীবন তিনি ঝিনাইদহ মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্বপালন করেছিলেন। মাদরাসা, মসজিদ, স্কুলসহ মানবতার সেবায় প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনি নিজের জীবনের অঙ্গ বানিয়ে নিয়েছিলেন। মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে অপরিহার্য মনে করতেন। জ্ঞানের সেবা এবং এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সদকায়ে জারিয়ার অনন্ত ধারা তার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বৈবাহিক জীবনে তার তিন কন্যা ও এক ছেলে রয়েছে। ছেলে ওসামা খন্দকার সৌদিআরবের রিয়াদ ইউনিভার্সিটিতে অধ্যায়নরত।

একটি সাক্ষাৎকারে শাইখ দাওয়াতের ক্ষেত্রে বলছিলেন,
দাওয়াতের ক্ষেত্রে একটা হলো “প্রায়োরিটি নির্ধারণ” কোন বিষয়টার দাওয়াত আগে দেবো? এটা আমরা ভুলে যাচ্ছি, বা ভুল করছি। এজন্য আমাদের ওয়াজ-মাহফিলে অগণিত দাওয়াত হচ্ছে, কিন্তু ঈমান, তাওহীদ, শিরক, বান্দার হক এ বিষয়গুলো দাওয়াতে আসছে না।

ড. জাহাঙ্গীর দলমত নির্বিশেষে এ দেশের মুসলমানদের ঐক্য এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ জীবনে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন; সেজন্য সচেষ্টও থাকতেন; দ্বীনের বিষয়ে ঝগড়া-বিবাদকে সবসময় পরিহার করতেন; ভিন্নমতের বিষয়গুলোকে জ্ঞান দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করতেন; কাউকে খাটো করে কথা বলা পছন্দ করতেন না; কুরআন-সুন্নাহর সঠিক কথাটি যথাযথভাবে লেখনী, বক্তব্য এবং দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। আরাম-আয়েশকে কখনোই প্রশয় দেননি। তিনি ছাত্রজীবনে একনিষ্ঠভাবে পড়ালেখা এবং কর্মজীবনে দ্বীনের প্রচার-প্রসার, জ্ঞান-গবেষণা, লেখালেখি, দাওয়াহ-সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যস্ত থাকতেন। জাতীয় প্রয়োজনেই তার জীবন-কর্মের ওপরে সবিস্তার গবেষণা হওয়া জরুরি।

১১ মে সকাল ৮টার একটু আগে বা পরে ঢাকা আসার সময় মাগুরা শহরের পারনান্দুলিয়ায় এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার মৃত্যুতে যেভাবে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশজুড়ে তা কেবল এই অসাধারণ মানুষটির প্রতি সবার অকুণ্ঠ ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাকেই জানান দেয়। আল্লাহ তার গুনাহসমূহ মাফ করে তাঁকে শহীদের মর্যাদায় জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করুক। আর আমাদেরকে তাঁর আলোচনা থেকে শিক্ষা নেয়ার তওফীক দান করুক, আমীন।

qaominews.com/কওমীনিউজ/এম

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ