প্রচ্ছদ কলাম, স্লাইডার

ইসলামের দৃষ্টিতে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মন্জুর | মঙ্গলবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ | পড়া হয়েছে 730 বার

ইসলামের দৃষ্টিতে মাতৃভাষার গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মায়ের ভাষার কথা বলা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। মাতৃভাষা মহান আল্লাহর অপার দান। এ ভাষা দিয়েই মানুষ নিজের মনের ভাষা প্রকাশ করে। তাই ইসলাম মা’র প্রতি যেমন অকৃত্রিম শ্রদ্ধাবোধ শিক্ষা দিয়েছে, তেমনি মাতৃভাষার প্রতিও অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ সকল নবী-রাসুলগণকে স্ব-জাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছেন, যাতে তাঁরা স্বীয় জাতিকে দ্বীনের দাওয়াত স্পষ্টভাবে পৌঁছোতে পারেন। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, আমি রাসুলগণকে তাঁদের স্বজাতির ভাষাভাষী করেই প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের (দ্বীন) স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন। (সূরা-ইব্রাহীম, আয়াত-৪)।

কুরআন মজীদের এ আয়াত থেকে ইসলামের দৃষ্টিতে মাতৃভাষার গুরুত্ব প্রতিভাত হওয়ার সাথে সাথে দ্বীনের পথে দাওয়াত দানকারীদের জন্য মাতৃভাষায় পারদর্শিতা অর্জনের নির্দেশনাও পাওয়া যায়। এ বিষয়ে কুরআন মজীদে আরো ইরশাদ হয়েছে,“আপনি আপনার রবের পথে দাওয়াত দিন কৌশল ও উত্তম ভাষণের মাধ্যমে। (সূরা-নাহল, আয়াত-১২৫)। সুতরাং এ কথা বুঝতে বাকী থাকে না যে, স্বজাতিকে উত্তম ভাষণের মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়ার জন্য বিশুদ্ধ মাতৃভাষার ওপর পারদর্শিতা অর্জন অনিবার্য।

আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সা. ইরশাদ করেন, “ আমি আরবদের মধ্যে সবচে বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জলভাষী। এতে প্রমাণিত হয় বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল মাতৃভাষায় কথা বলার যোগ্যতা অর্জন করা রাসুল সা.- এর আদর্শ। আল্লাহ দ্রোহী সম্রাট ফেরআউনকে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার লক্ষ্যে মুসা আ. নিজ ভাই হারুনকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট দু’আ করেছিলেন। কারণ হারুন আ. খুব সুন্দর স্পষ্ট ভাষায় কথা বলতে ও বুঝাতে পারতেন। কুরআনে কারীমে এসেছে, “ (হে প্রভূ) আমার ভাই হারুন আমার চেয়ে সুন্দর ও স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে। সুতরাং তাকে আমার সাথে সাহায্যকারী হিসেবে প্রেরণ করুন।” (সূরা-ক্বাসাস, আয়াত ৩৪)। তথাপি মহান আল্লাহর নিদর্শন হিসেবেও মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও যত্নবান হওয়া ঈমানী কর্তব্য। কুরআন মজীদের বর্ণনা অনুযায়ী ভাষা বৈচিত্র মহান আল্লাহর অনুপম নিদর্শন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,“ তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে এক নিদর্শন এই যে, নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র। নিশ্চয় এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে।”( সূরা-রুম, আয়াত-২২)। এই আয়াত প্রতীয়মান হয় আমাদের মাতৃভাষা বাংলাও মহান আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলীর অন্তর্ভূক্ত। তাই এ ভাষার প্রতি যথার্থ সম্মান প্রদর্শনসহ যত্নশীল হওয়াটাও মহান আল্লাহ পাকের নিদর্শনাবলীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও যত্ননবান হওয়ার নির্দেশনায় শামিল।

 

a monjur

লেখক: হাফেজ মুহাম্মদ আবুল মন্জুর

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে বলতে হয় তৎকালীন পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠি আমাদের ভাষার অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল। মরিয়া হয়ে উঠেছিল উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দিতে। তাদের এই অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে বাংলাভাষাভাষীরা গড়ে তুলেন তীব্র আন্দোলন। মুসলিম সাংস্কৃতিক কর্মীদের বুদ্ধিদীপ্ত সংগঠন তমুদ্দন মজলিস ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রধান সংগঠক। এই সংগঠন-ই সর্ব প্রথম “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দূ না বাংলা” নামে পুস্তিকা প্রকাশের মধ্যদিয়ে, মিছিল, মিটিং ও পত্রিকায় লেখালেখি করে বাংলা ভাষার পক্ষে, উর্দূর বিপক্ষে সৃষ্টি করেন দূর্বার আন্দোলন । যার প্রত্যক্ষ ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বে ছিলেন, প্রিন্সিপ্যাল আবুল কাসেম, ড. মোহম্মদ শহীদুল্লাগ, ড. এস.এম.নুরুল হক ভূঁইয়া,শাইখুল ইসলাম মাওলানা আতহার আলী, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, এড. কাজী গোলাম মাহবুব, এড. গাজীউল হক, অধ্যাপক শাহেদ আলী, এড. মৌলভী ফরিদ আহমদ, অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফসহ বাংলার অনেক বীর সেনানী।

বাংলার আবাল, বৃদ্ধ, বণিতা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার এই লড়াইয়ে ঝাপিয়ে পড়ে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই” শ্লোগানে মুখরিত করে তুলেন রাজপথ। এই দূর্বার আন্দোলনে শামিল হয়ে মায়ের ভাষার জন্য বুকের তাজা রক্ত উৎসর্গ করেন এদেশের বহু ছাত্রজনতা। ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়াররি সংগ্রামরত অবস্থায় পুলিশের গুলিতে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন বরকত, সালাম, জব্বার, শফিক ও রফিকসহ নাম না জানা আরো অনেক বীর সন্তানেরা। এভাবে মাতৃভাষার জন্য রক্তদান বা শাহাদত বরণের ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষার দীপ্ত শপথে উৎসর্গকৃত তাজা রক্তের বদৌলতেই আমাদের মাতৃভাষা বাংলা রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি লাভ করে এবং রক্তে রঞ্জিত ২১শে ফেব্র“য়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদায় ভূষিত হয়। আামাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা সৃষ্টিতে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনই প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করে। ভাষা আন্দোলনের এই গৌরবোজ্জ্বল রক্তিম ইতিহাস জাতিকে অনুপ্রাণিত করবে যুগ থেকে যুগান্তরে এটি আমাদের প্রত্যাশা।

কিন্তু তিক্ত হলেও সত্য, যে লক্ষ্য, চেতনা ও আবেগ নিয়ে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল আন্দোলনের ৬০ বছরেরও অধিক এই সময়ের সে চেতনার প্রতিফলন তথা মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহার সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠাত লাভ করেনি। যে আবেগ ও প্রেরণা নিয়ে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল মাতৃভাষা বাংলার প্রতি নবপ্রজন্মের সেই ভালোবাসা নেই বলে মনে হচ্ছে। হিন্দি সিনেমা ও সিরিয়াল দেখে শিশুরা হিন্দি কথা বলতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। উচ্চবিত্তরা তাদের সন্তানদের ইংরেজী মাধ্যমে পড়ানোর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এটিকে অনেকে এক ধরণের আভিজাত্য বা স্ট্যাটাস সিম্বল বলে মনে করেছেন।

বাংলা ভাষার প্রতি এ রকম উদাসীনতা মাতৃভাষাকে অবজ্ঞা ও ভাষা শহীদের আত্মত্যাগকে অবমূল্যায়ন করার শামিল নয়কি? এ জন্য কি ভিনদেশী ভাষা ও বিজাতীয় সংস্কৃতিকে ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা চালুকারী অতি প্রগতিবাদীরা দায়ী নয়?

আসুন! ভাষা আন্দোলনের রক্তিম স্মৃতিবিজড়িত এই মাসে শপথ নিই, মায়ের ভাষাকে ভিনদেশী আগ্রাসনমুক্ত করার। পরিহার করি ভিনদেশী ভাষাকে ফ্যাশন হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা। রুখে দাঁড়াই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে। মাতৃভাষার বিশুদ্ধ চর্চা ও প্রয়োগে সচেষ্ট হই এবং বিশাল এ নিয়ামতের জন্য মহান আল্লাহর শোকরিয়া আদায় করি। সেই সাথে যারা মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে শাহাদাৎবরণ করেছেন তাঁদের রুহের মাগফিরাতের জন্য দু’আ করি।

লেখকঃ যুগ্ম সাধারণ সমপাদক, কক্সবাজার ইসলামী সাহিত্য ও গবেষণা পরিষদ।
সাধারণ সম্পাদক, রামু লেখক ফোরাম।

hafezabulmanzur@gmail.com

qaominews.com/কওমীনিউজ/এএন

 

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ