প্রচ্ছদ মনীষী জীবন, স্লাইডার

ইসলামী রাজনীতিতে হাজি মাওলানা ইউনুস রহ.

সাঈদ হোসাইন | শনিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 3491 বার

ইসলামী রাজনীতিতে হাজি মাওলানা ইউনুস রহ.

হাজি মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস (১৯০৬-১৯৯২)

ব্রিটিশ আমল, পাকিস্তান শাসনকাল ও বাংলাদেশ সময়কালে যারা ইসলামী রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা ও স্বর্ণোজ্জ্বল অবদান রেখেছেন তাদের অন্যতম হলেন জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার সাবেক মহাপরিচালক শাইখুল আরব ওয়াল-আজম মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস (হাজি সাহেব হুজুর) রহ.। বক্ষমান নিবন্ধে এ সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত করার প্রয়াস পাবো ইনশাআল্লাহ।

মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস ছিলেন অত্যন্ত রাজনীতিসচেতন ব্যক্তি। ‘দীন এবং রাজনীতি দুটি যমজ সন্তান’ শাহ ওয়ালী উল্লাহ মোহাদ্দেসে দেহলভীর এই উক্তি তার জীবনকে আন্দোলিত করে। ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত রাসুলের আদর্শ অনুযায়ী পরিচালিত করাই ঈমানের দাবি। ধর্ম থেকে রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার পাশ্চাত্য অপপ্রচারের তিনি ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ওলামায়েকেরামের মধ্যে যারা রাজনীতিবিমুখ তাদেরকে রাজনীতির প্রতি উৎসাহিত করতেন। তিনি পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে সারা জীবন রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। শাইখুল ইসলাম মাওলানা আতহার আলী রহ. মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দীন রহ. ও খতীবে আজম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ রহ. ছিলেন তার রাজনৈতিক গুরু। [কুতবে জমান, শাইখুল আরব ওয়াল-আজম আল্লামা শাহ হাজী মুহাম্মদ ইউনুস রহ. জীবন কর্ম অবদান, লেখক মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, ফেব্রুয়ারী ২০১৫, পৃ. ২৪৫]

তার ছাত্রজীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ই শুরু হয় ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দে। ১৯৩২ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর এখানেই কাটান। এখানে তিনি দাওরায়ে হাদীস (মাস্টার্স সমমান) সমাপ্ত করেন এবং কয়েকটি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. ছিলেন তার বুখারি ও তিরমিজি শরিফের উস্তাদ। দেওবন্দের পাঁচ বছরে তিনি মাদানী রহ.-কে ইংরেজ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে অন্দোলন করতে এবং অগ্নিঝরা বক্তব্য দিতে দেখেছেন। মাওলানার এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ড তার চেতনাকে শাণিত করে এবং ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে শরীক হতে উজ্জীবিত করে।

এ সম্পর্কে প্রখ্যাত আলেম, সুলেখক ও রাজনীতিসচেতন ব্যক্তি মাওলানা আবদুর রহীম ইসলামাবাদী লিখেন, ‘…বৃটিশবিরোধী আন্দোলন, পাকিস্তান আন্দোলন এবং পাকিস্তান আমলে পরিচালিত ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন তিনি দেখেছেন খুব নিকট থেকে। নিজেও তিনি এর একজন কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। …শিক্ষাজীবন সমাপ্তির পর তিনি আপন উস্তাদ ও বুজুর্গদের সাথে জমীয়তে ওলামায়ে হিন্দের নেতৃত্বে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে শরীক হন। [আত্-তাওহীদ হাজী ইউনুস রহ. বিশেষ সংখ্যা, আগস্ট ১৯৯২]

বিশিষ্ট লেখক ও সাহিত্যিক সিরাজুদ্দীন ইমাম সাহেব লিখেন, ‘রাজনৈতিক ময়দানে তার পদচারণাও বড় চমৎকার। তিনি ধর্ম ও রাজনীতিকে বিভক্ত করতেন না। ছাত্রজীবনের পর পর তিনি জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের নেতৃত্বে বৃটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। [দৈনিক সংগ্রামের মাওলানা শাহ মুহাম্মদ ইউনুছ স্মরণে বিশেষ ক্রোড়পত্র, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৩]

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তানে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ইতিহাসের একটি সোনালি অধ্যায় হওয়ায় এখানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর, কলামিস্ট ড. মাহফুজ পারভেজের একটি লেখা থেকে উদ্ধৃত করছি—

‘খতিবে আযম এবং তার দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির অপরাপর নেতা মাওলানা যফর আহমদ ওসমানি, মাওলানা আতহার আলী, মুফতি মুহাম্মদ শফি,  মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুছ, মাওলানা আবদুল মতিন খতীব, মাওলানা বাদশা গুল প্রমুখ সর্বাবস্থায় পাকিস্তানে একটি ইসলামী শাসন ব্যবস্থা ও সংবিধান প্রণয়নে সর্বাত্মক চেষ্টা করেন। কিন্তু বারবার সামরিক শাসন এনে অখণ্ড পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাকে ব্যাহত করে। অন্যদিকে ইসলামবিরোধী অপরাপর মতবাদের অনুসারীরা আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ দিতে থাকে। এমতাবস্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ কঠিন হয়ে গেলেও বিশ্বাসী ও আদর্শিক রাজনীতিবিদগণ সেটা অব্যাহত রাখেন। বিস্তারিত জানতে দেখুন: Khalid bin Sayeed, The Political System of Pakistan, Karachi: Oxford University Press, 1967. [মাসিক আত্-তাওহীদ, সেপ্টেম্বর ২০১৪, পৃ. ৩৯]

লেখক ও সাহিত্যিক সিরাজুদ্দীন ইমাম লিখেন, ‘পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির মাধ্যমে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে মাওলানা ইউনুস রহ. নেতৃত্ব দেন। তিনি ১৯৬৯ সালে করাচীতে অনুষ্ঠিত নেজামে ইসলাম পার্টির সাংবাদিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। তার শিক্ষা ও রাজনৈতিক গুরু খতিবে আযম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ রহ-র তিনি ছিলেন অন্যতম রাজনৈতিক সহকর্মী। দেশের গণমানুষের পাশাপাশি বহির্বিশ্বেও তিনি ছিলেন সুপরিচিত। ভারত-পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের সকল দেশে তাঁর অগনিত ভক্ত অনুরক্ত রয়েছে। কাবা শরীফেরর মহামান্য ইমামের সাথে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল আন্তরিক। তার ব্যক্তিগত দাওয়াতে সম্মানিত ইমাম শেখ মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ সুবাইল দু’ দুবার বাংলাদেশ সফর করেন। [দৈনিক সংগ্রামের মাওলানা শাহ মুহাম্মদ ইউনুছ স্মরণে বিশেষ ক্রোড়পত্র, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯৩]

পাকিস্তান আমলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে দীনি চেতনা সৃষ্টির জন্য উল্লখযোগ্য কোন ইসলামী ছাত্রসংগঠন ছিল না। তখন ব্যাপকভিত্তিক একটি ইসলামী ছাত্রসংগঠনের প্রয়োজন তীব্রভাবে অনুভূত হয়। সে সময় পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম ‘ইসলামী ছাত্রসমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এতে মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস রহ.ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এখানে ১৯৬৯ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর মারকাযী জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের করাচীস্থ সদর দপ্তরে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে ‘ইসলামী ছাত্রসমাজ’ প্রতিষ্ঠার যে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হয় তার রিপোর্টটি পাকিস্তানের ‘দৈনিক জঙ্গ’ পত্রিকা থেকে উদ্ধৃত করছি।

মারকাযী জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের করাচীস্থ সদর দপ্তরে আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে দলের সভাপতি আল্লামা যফর আহমদ ওসমানী রহ. কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ ছাত্রদের মাঝে দ্বীনি কাজ করার জন্য একটি ছাত্র সংগঠন করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যান্য নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হযরত মাওলানা আতহার আলী রহ., মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ., দলের মহাসচিব খতিবে আজম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদ রহ., হাজী মাওলানা মোহাম্মদ ইউনুছ রহ.ও মাওলানা আবদুল মতিন খতিব রহ.। (দৈনিক জঙ্গ, করাচী ০৪/০৯/৬৯) [সূত্র: ঢাকা মহানগর সম্মেলন স্মারক ‘৯০ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসমাজ, পৃ. ২৯-৩০]

প্রসঙ্গত ‘ঢাকা মহানগর সম্মেলন স্মারক’৯০ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসমাজ’-এ মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিমত এখানে উদ্ধৃত করা সঙ্গত মনে করছি—

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আমি জেনে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি যে, ‘ইসলামী ছাত্রসমাজ’, ঢাকা মহানগরী শাখার উদ্যোগে একটি স্মরণিকা প্রকাশিত হচ্ছে। দীর্ঘকাল ধরে ইসলামী ছাত্রসমাজের আন্দোলনের সাথে আমি পরিচিত। এ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের চারিত্রিক দৃঢ়তা, ঔদার্যপূর্ণ ব্যবহার ও মানুষকে সহজে আপন করে নেয়ার মতো মহৎ গুণাবলী সর্বস্তরের ছাত্রজনতার মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে।

আমাদের মুরব্বীদের হাতে গড়া ইসলামী ছাত্রসমাজের পতাকাতলে জমায়েত হয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নির্দেশিত পথে রসুলে মকবুলের সা. প্রদর্শিত পদ্ধতিতে নিজেদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন গঠন করার জন্য প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে সকল ছাত্রদের এগিয়ে আসা উচিৎ।

আল্লাহ পাক বাতিলের মোকাবেলায় দ্বীনে হকের পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার যোগ্যতা, ইখলাস ও সাহসিকতা ছাত্রসমাজ কর্মীদের দান করুন আমিন। [ঢাকা মহানগর সম্মেলন স্মারক ‘৯০ বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসমাজ, পৃ. ৫]

১৯৬৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মারকাযী জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের সাংবাদিক সম্মেলনের তিন দিন পর ৭ সেপ্টেম্বর করাচীতে আয়োজিত নেজামে ইসলাম পার্টির সংবাদ সম্মেলনে মাওলানা ইউনুস রহ. নিজের বক্তব্য পেশ করেন। এ সম্পর্কে লেখক ও সাহিত্যিক মাওলানা মাসউদুল কাদির ‘পটিয়ার দশ মনীষী’তে লিখেন, পাকিস্তান আমলে ১৯৬৯ (৭ সেপ্টেম্বর ঈসায়ীতে) করাচীতে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে মাওলানা ইউনুস রহ. ভাষণ দেন। (পৃ. ৪৯)

পাকিস্তানে সেসময় ইসলামী শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এবং সমাজতন্ত্র মতবাদ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা প্রবলভাবে দেখা দিয়েছিল। তখন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ওলামায়েকেরাম মিলে এই সাংবাদিক সম্মেলন করেন। এতে উপস্থিত ছিলেন মাওলানা যফর আহমদ উসমানী রহ., মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ., খতিবে আজম ছিদ্দিক আহমদ রহ., মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস রহ. প্রমুখ। [সূত্রঃ মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ. জীবন ও কর্ম- মুফতী মুহাম্মদ রফী উসমানী, অনুবাদ-মাওলানা হারুনুর রশীদ পৃ. ১৯৮, মাসিক আত্-তাওহীদ, সেপ্টেম্বর ২০১৪, পৃ. ৩৯, পাটিয়ার দশ মনীষী- মাসউদুল কাদির, পৃ. ৪৯]

এখানে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তার একটি মন্তব্য উল্লেখ করা সমীচীন হবে বলে মনে করছি, তিনি বলেন, ‘সমাজতন্ত্র মতবাদের বিপ্লব প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহে। এই মতবাদের ভিত্তি ছিল ইসলামের দুর্গের মূলোৎপাটন করা। এই আন্দোলন রাষ্ট্র ও সরকার থেকে ধর্ম-কর্ম তো সমূলে উৎখাত করল, তদুপরি মানুষের অন্তরে ও জাতির বিবেকবুদ্ধিতে অল্প যা দ্বীন-ধর্ম বাকি ছিল তাতেও প্রত্যক্ষভাবে আঘাত হানতে লাগল। তাদের ঈমান-আকীদা, আনুগত্য-অনুকরণ থেকে নিয়ে ধর্মপালনে মানবীয় অধিকারে পর্যন্ত তারা হস্তক্ষেপ করতে লাগল। তাই আমরা সমাজতন্ত্রের পতনে তেমন চমকিত হই না। যদিও আমাদের ছোট-বড় মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও অন্যান্য ধর্মের নেতাদের কাছেও তা অত্যন্ত বিস্ময়কর বলে মনে হয়েছে।

কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের সঙ্গে বলতে হচ্ছে যে, বিশ্ব মুসলিম নেতৃবৃন্দ দ্বিতীয় আরেকটি ব্যাপারে খুবই উদাসীন থাকেন। আর তা হলো, শত্রুপক্ষ থেকে লেলিয়ে দেয়া আক্রমণকে অগোচরে রেখে দেয়া। অথচ শত্রুরা এরই অপেক্ষায় আছে [কুতবে জমান, শাইখুল আরব ওয়াল-আজম আল্লামা শাহ হাজী মুহাম্মদ ইউনুস রহ. জীবন কর্ম অবদান, লেখক মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, ফেব্রুয়ারী ২০১৫, পৃ. ৩৩০]।’

হাজী মাওলানা ইউনুস রহ.

১৯৭০ সালে হজরত মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস (হাজী সাহেব হুজুর) রহ তৎকালীন পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের আহলে সুন্নাত, দেওবন্দী, ব্রেলভী আহলে হাদীস, শিয়াসহ বিভিন্ন মতের ২৩১ জন শীর্ষস্থানীয় বিশিষ্ট আলেমগণের সাথে এক যুক্ত ফতওয়া প্রদান করেন। এ ফতওয়ার মাধ্যমে ওলামাগণ ইসলাম ও পাকিস্তানের পক্ষে সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদকে সবচে’ বড় বিপদ ও ফিতনা আখ্যায়িত করেন এবং এসবের বিরুদ্ধে জিহাদ করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরজ বলে ঘোষণা দেন।

ঐতিহাসিক এ ফতওয়ায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে যে যেসব দল সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে খাঁটি ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাচ্ছে, তাঁরা সবাই জিহাদে লিপ্ত তাঁদের সাহায্য-সহযোগিতা করা ও ভোট দেয়া শরীয়ত মতে জিহাদের পর্যায়ভুক্ত।

ফতওয়ায় স্বাক্ষরকারী ওলামাদের মতে সমাজতন্ত্রের (Communism) দাবীদার দলগুলো কোরআন ও সুন্নাহ এবং ইসলামের বিদ্রোহী। তাদের সাহায্য-সহযোগিতা করা, তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া প্রভৃতি কুফরের সহযোগিতারই নামান্তর ও কঠোরভাবে হারাম। তদ্রূপ আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের প্রচারক সাহায্য-সহযোগিতা করাও নাজায়েজ ও গোনাহ। (বিস্তারিত জানতে দেখুন- খতিবে আজম মাওলানা ছিদ্দিক আহমদঃ একটি যুগ-বিপ্লব উৎস, লেখকঃ আ ফ ম খালিদ হোসেন,চিন্থাধারা প্রকাশন, মার্চ ১৯৮৯, পৃ.১৩১-১৪২)

১৯৭১ সালে মেজর জিয়া কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করলে সারাদেশে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায়। কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটি তখন পাকিস্তানিদের শ্যেনদৃষ্টিতে পড়ে যায়। চৌকস মেজর জিয়া তখন বেতারের সরঞ্জামাদী নিয়ে পটিয়ার দিকে যাত্রা করেন। তৎকালীন পটিয়া মাদরাসার মহাপরিচালক ছিলেন হাজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস রহ.। তিনি মেজর জিয়া ও তার বাহিনীকে নিরাপদ স্থান জামিয়া পটিয়ায় অবস্থান করার জন্য সাদরে আমন্ত্রণ জানান।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হলে হযরত হাজী সাহেব হুযুর নেজামে ইসলাম পার্টির পৃষ্ঠপোষকের দায়িত্বপালন করেন। নেজামে ইসলাম পার্টি তৎকালে তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ‘দৈনিক জিন্দেগী’ নামে একটি পত্রিকা বের করে। এটি নেজামে ইসলাম পার্টির মুখপত্র হয়ে কাজ করে। পার্টির উত্তরোত্তর উন্নতির ক্ষেত্রে যুগোপযোগী পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেন। [পাটিয়ার দশ মনীষী-মাসউদুল কাদির, পৃ.৫০]

এক সাক্ষাৎকারে পটিয়া মাদরাসার সাবেক সিনিয়র শিক্ষক ও বর্তমান হাটহাজরী মাদরাসার মুহাদ্দিস মাওলানা মমতাজুল করিম (বাবা হুজুর) বলেন, মেজর জিয়াউর রহমান যখন প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন তিনি একবার হাজী মাওলানা মুহাম্মদ ইউনুস রহ.-এর কাছ থেকে দোয়া নিতে পটিয়া মাদরাসায় আগমন করেন। হাজী সাহেব হুজুর রহ. তাকে নছিহত করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া পটিয়া মাদরাসা পরিদর্শন করে বলেন, এরকম প্রতিষ্ঠান পৃথিবীতে খুব কমই আছে। আপনাদের যা প্রয়োজন তা আমাদের বললেই পাবেন।

পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের আহ্বানে ইসলামী বিশ্বের নেতৃবৃন্দ ও উলামায়ে কেরামের একটি কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাংলাদেশ থেকে একটি প্রতিনিধি দল উপস্থিত হয়। দলের প্রধান ছিলেন হাজী মাওলানা ইউনুস রহ.। পরে কী এক মতানৈক্যের কারণে তিনি সেখান থেকে তাঁর নেতৃত্বাধীন পুরো দলটি নিয়ে চলে আসেন।

এ সম্পর্কে মাওলানা মুফতী আব্দুস সালাম চাটগামির স্মৃতিচারণমূলক প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃত করছি, তিনি লিখেন- ‘যখন পাকিস্তানে ইসলামী বিশ্বের নেতৃবৃন্দ ও ওলামায়ে কিরামের কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হলো সেখানে পটিয়া মাদরাসার প্রতিনিধি দল উপস্থিত হয়েছিল। দলের প্রধান ছিলেন হযরত হাজী সাহেব হুজুর রহ.। দলে তিনি ছাড়া ছয় জন ছিলেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের আহ্বানে এসব অথিতি আমন্ত্রিত হন। তারা হাবীব ব্যাংক-এ অনুষ্ঠিত সম্মেলনে উপস্থিত হন। কনফারেন্স তিন দিনব্যাপী ছিল। তারা ওই তিন দিন সরকারি অথিতি ছিলেন। মতের অনৈক্য হওয়ায় হাজী সাহেব রহ. তার নেতৃত্বাধীন পুরো দলটিকে নিয়ে বিন্নুরি টাউনে চলে আসেন [কুতবে জমান, শাইখুল আরব ওয়াল-আজম আল্লামা শাহ হাজী মুহাম্মদ ইউনুস রহ. জীবন কর্ম অবদান, লেখক- মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ, ফেব্রুয়ারী ২০১৫, পৃ.৪৯৭]।’

১৯৭৯ সালে নেজামে ইসলাম পার্টির ঐতিহাসিক মক্কা সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। এতে তিনি নেজামে ইসলাম পার্টির সফলতা-ব্যর্থতার উপর দীর্ঘ আলোচনা পেশ করেন। ‘আই.ডি.এল ভেঙে যাবার পর নেজামে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে হতাশার সঞ্চার হয়। দলের গতিধারা এখানে এসে জেন কিছুটা স্থিমিত হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭৯ সালে ইসলামী আন্দোলনের প্রতিশ্রুতিশীল কর্মী মাওলানা আবদুল মালেক হালিম ও মাওলানা মোহাম্মদ সরওয়ার কামাল আজিজী পবিত্র মক্কা-মোকাররমার খিদুয়াতে বাংলাদেশের খ্যাতনামা ইসলামী রাজনীতিক ও প্রাক্তন নেজামে ইসলাম নেতৃবৃন্দের এক কনভেনশন আহ্বান করেন।

প্রসঙ্গত, হাজি ইউনুস রহ. জামিয়া ইসলামিয়া পটিয়ার পরিচালনাসহ দেশে হাজার হাজার মসজিদ, মাদরাসা ও মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশেরও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এবং মৃত্যু পর্যন্ত সেই দায়িত্বপালন করেন। নেজামে ইসলাম পার্টি কর্তৃক কওমী মাদরাসা শিক্ষার মান উন্নয়ন ও অগ্রগতির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই অংশ বেফাক প্রতিষ্ঠা। তাই বেফাকের আমৃত্যু সভাপতি হাজি ইউনুস রহ. এবং প্রথম ও দ্বিতীয় মহাসচিব যথাক্রমে শাইখুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক ও মাওলানা আতাউর রহমান খান (১৯৭৯-৯১)।  উল্লেখিত তিনজনই ছিলেন নেজামে ইসলাম পার্টির ঘনিষ্টজন।

qaominews.com/কওমীনিউজ/এম

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ