প্রচ্ছদ মনীষী জীবন, স্লাইডার

স্মরণ

আবদুল মান্নান শায়খে গুনই

রুহুল আমীন নগরী | রবিবার, ২৪ জানুয়ারি ২০১৬ | পড়া হয়েছে 1553 বার

আবদুল মান্নান শায়খে গুনই

উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নেতা সায়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানী রহ.-এর খলিফা, সিলেটের প্রখ্যাত আলেম শাহ আবদুল মান্নান শায়খে গুনই। তিনি ৭ এপ্রিল ২০১৫ মঙ্গলবার বানিয়াচংয়ের নিজবাড়ীতে ইন্তেকাল করেন।

শায়খে গুনই ১৯২৭ ঈসায়ী মোতাবেক ১৩৩৩ বাংলার ১৩ আশ্বিন  হবিগঞ্জের বানিয়াচং থানার গুনই ফকিরবাড়ীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আলহাজ শাহ শফিক আলী, মাতার নাম মালিক জান বিবি। তারা একই বংশের ছিলেন। সম্পর্কে চাচাতো ভাই-বোন। শায়খে গুনইর পুর্বপুরুষগণ পবিত্র মক্কার কুরাইশ গোত্রীয়। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, মহান দরবেশ হযরত শাহজালাল রহ.-এর অন্যতম সাথী হজরত শাহ তাজউদ্দীন কুরাইশী এর বংশধর ছিলেন। তাজ উদ্দীন কুরাইশী রহ. সিলেট বিজয়ের পর তরফ অঞ্চলে নাসির উদ্দীন সিপাহসালারের সাথে আগমন করেন। পরে তরফ অঞ্চলে তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। তারই বংশে  জন্মগ্রহণ করেন শায়খ শাহ আবদুল মান্নান।

ছয় বছর বয়সে শিশু আবদুল মান্নানকে গুনই প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করা হয়। ১১ বছর বয়সে প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি মক্তবে কালিমা কালাম ও আমপাড়া শিক্ষা সম্পন্ন করেন। ১২ বছর বয়সে এশিয়ার বৃহত্তম গ্রাম বানিয়াচং এল.আর হাইস্কুলে ভর্তি হন। কয়েক বছর লেখাপড়ার পর স্নেহময়ী মাতার ইন্তেকাল করেন। ১৭/১৮ বছর বয়সে ধুলিয়া নিবাসী মাওলানা ইব্রাহিম রহ. গুনই ফয়জে আম মাদরাসায় শিক্ষক হয়ে আসলে তার সান্নিধ্যে থেকেই পবিত্র কোরআন শরীফ ও প্রাথমিক অন্যান্য কিতাবাদী অধ্যায়ন করেন। একই বছর বানিয়াচং আলিয়া মাদরাসায় ছরফ জামাতে ভর্তি হন। বানিয়াচং জামেয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া আলিয়ায় ২ বছর, এর পরে কানাইঘাটের ঐতিহ্যবাহী গাছবাড়ী জামেউল উলুমে  কাফিয়া জামাতে ভর্তি হন। শায়খুল হাদীস মুশাহিদ বায়মপুরী রহ. এ বছরই শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। সেখান থেকেই বায়মপুরীর সাথে শায়খে গুনইর ঘনিষ্টতা। গাছবাড়ী মাদরাসায় আলিয়া শেষ বর্ষে অধ্যয়নকালীন কওমী-আলিয়া দ্বন্দের কারণে তিনি  চলে আসেন কানাইঘাট দারুল উলুমে। সেখানে ২ বছর ধারাবাহিক লেখাপড়া শেষে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে দাওরায়ে হাদীস পাশ করেন । দারুল উলুম কানাইঘাট থেকে দাওরায়ে হাদীস পাশ করে বিশ্ববিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। দ্বিতীয়বারের মতো দাওরায়ে হাদীস পড়ার আবেদন নাকচ করে শায়খুল ইসলাম হযরত মাদানী রহ. স্বীয় মাথার পাগড়ী উপহার দিয়ে বায়াত করেন। এভাবেই প্রবেশ করেন আধ্যাত্মিক জগতের  ভুবনে। দারুল উলুম দেওবন্দ ও স্বীয় মুর্শিদের সান্নিধ্য থেকে ১৩৬৪ বাংলার ২৬ বৈশাখ দেশে ফিরে আসার পর দিনারপুর-বালিদাড়া মাদরাসায় শিক্ষকতার মাধ্যমে কর্মজীবন শুরুকরেন। সেখানে ২ বছর শিক্ষকতার পর পিতার হজে যাওয়ার কারণে তিনি বাড়ীতে চলে আসেন। এর পরের বছর থেকে গুনই ফয়জে আম মাদরাসায় খেদমতে আত্মনিয়োগ করেন। আমৃত্যু গুনই ফয়জে আম মাদরাসার সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন।

মিশকাত শরীফে ভর্তি হওয়ার আগেই পিতার আব্দার রক্ষায় পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। পারিবারিক জীবনে তিনি দুটি বিয়ে করেন। প্রথমা স্ত্রী আপন চাচাত বোন (আলহাজ শাহ রফিক আলীর দ্বিতীয় কন্যা) আনছবা খাতুনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আনছবা খাতুর বানিয়াচং আমির খানী লস্করবাড়ী এলাহী বখশের নাতনী। পরবর্তীতে করচা গ্রাম নিবাসী মনাফ মিয়ার দ্বিতীয় কন্যা ছুফিয়া খাতুনের সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। প্রথম স্ত্রীর তরফে এক ছেলে ও দুই মেয়ে জীবিত আছেন। ছেলের নাম মাওলানা শাহ খলিল আহমদ। তিনি বর্তমানে গুনই ফয়জে আম মাদরাসার মুহতামিমের দায়িত্বপালন করছেন। মাওলানা শাহ খলিল আহমদের শ্বশুর হলেন শায়খুল হাদীস মাওলানা মকবুল হুসাইন আসগরী। দ্বিতীয় তরফের ২ ছেলে, তারা হলেন যথাক্রমে হাফেজ মাওলানা শাহ সালেহ আহমদ ও শাহ নেসার আহমদ। শায়খের ৬ কন্যার সকলেই দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত। তৃতীয় কন্যা ছিদ্দিকা খাতুনকে বিয়ে দেন ঢাকা মহানগর জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সভাপতি প্রখ্যাত পীর সদ্যপ্রয়াত মুফতি আবদুল আউয়াল উয়াইসীর কাছে।

সায়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানীর সর্বমোট ১৬৭ জন খলিফার মধ্যে বাংলাদেশি ৫০ জন। তন্মধ্যে বৃহত্তর সিলেটেই ৩০ জন। মাদানী রহ.-এর বাংলাদেশি খলিফাদের মধ্যে বর্তমানে ৩ জন জীবিত আছেন। তারা হলেন আল্লামা আহমাদ শফী, ছদরে জমিয়ত মাওলানা আবদুল মোমিন শায়খে ইমামবাড়ী ও মাওলানা নোমান আহমদ চট্রগ্রামী।

শায়খে গুনই কাছার জেলার বাশকান্দিতে মাদানী রহ.-এর সাথে এতেকাফ করেছেন একাধিকবার। নিয়মিতভাবে কয়েকবার চিল্লা ও করেন। কোন এক রমজানের ২৮ তারিখ ৪২ জনকে আধ্যাত্মিক সাধনার ফল স্বরূপ ইজাজাত প্রদান করেন। এই তালিকায় তন্মধ্যে  হবিগঞ্জ গুনই নিবাসী মাওলানা আবদুল মান্নানের নাম ও ছিলো। মাওলানা মুহিউদ্দীন খান অনূদিত ‘চেরাগে মুহাম্মদ’ গ্রন্থে হোসাইন আহমদ মাদানীর ইযাজতপ্রাপ্ত খলিফাদের যে তালিকা উল্লেখ করা হয়েছে সে তালিকায় ২২ নম্বরে শায়খে গুনইর নাম রয়েছে।

শায়খে গুনই

আবদুল মান্নান শায়খে গুনই রহ.

শায়খে গুনই পবিত্র মক্কা-মদীনা জিয়ারতের জন্য একদা পেরেশান হয়ে যান, তখন স্বীয় প্রাথমিক উস্তাদ মাওলানা ইব্রাহিমের পরামর্শে  নিয়মিত দালাইলুল খাইরাত তেলাওয়াত করতেন। কিছুদিন এই আমল করার পর কদুপুর নিবাসী মাওলানা কারী মিসবাহুজ্জামান কর্তৃক মাত্র এক সপ্তাহের মধ্য দালাইলুল খাইরাতের ইযাজতপ্রাপ্ত হন।  উল্লেখ্য যে, কারী মিসবাহুজ্জামান রায়ধর নিবাসী মাওলানা আছআদ উল্লাহ থেকে এবং তিনি মাওলানা শায়খ  আবদুল হক ইলাহবাদী  থেকে ইযাজতপ্রাপ্ত হন। দালাইলুল খাইরাত, হিজবুল বাহারসহ সুলূকের রাস্তায় অন্তত ২ শতাধিক ব্যক্তিকে ইযাজত প্রদান করেছেন। উল্লেখযোগ্য খলিফাদের কয়েকজন হলেন মাওলানা ইব্রাহিম, ধুলিয়া-বানিয়াচঙ্গ (হযরতের উস্তাদ), মাওলানা ফজলুর রহমান, দেবপাড়া নবীগঞ্জ, মাওলানা আবদুল গফুর, বালিদাড়া, নবীগঞ্জ, হেকিম মৌলভী আব্দুল মান্নান, দত্তগ্রাম, মুফতি মাওলানা তালিব উদ্দীন, সাতাইহাল, সৈয়দ নেসার আহমদ, ভাড়েরা, মাওলানা সিরাজুল হক, নেত্রকোণা, মাওলানা শাহ আবদুল লতিফ বেগুনাই, মাস্টার আবদুস শহীদ ময়মনসিংহ, মাওলানা আব্বাস আলী কিশোরগঞ্জ, মাওলানা হুসাইন আহমদ দিগরবাগ, মাওলানা জয়নাল আবেদীন জামালগঞ্জ, মাওলানা আবদুল করিম শাখাইতি, মাওলানা ফজলুল হক, ফাজিল চিশত সিলেট প্রমুখ। (সূত্র: শায়খ তাজুল ইসলাম ও শায়খ মুহসিন আহমদ রফু সম্পাদিত মাওলানা শায়খ শাহ আবদুল মান্নানের জীবন ও সাধনা।

৬ বারের ও অধিক পবিত্র হজ পালন করেন। ১৩৮৩ বাংলায় প্রথম হজ পালন করেন। রাজনৈতিক মযদানে তিনি স্বীয় মুর্শিদের স্মৃতিবিজড়িত জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের কর্মী ছিলেন। জমিয়তের সাথে নিজেকে আজীবন সম্পর্ক রাখেন। আমৃত্যু জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের পৃষ্টপোষক ছিলেন। স্বাধীন বাংলাদেশে জমিয়তের প্রথম সাধারণ সম্পাদক মুফতি আহরারুজ্জামান ছিলেন তার ফুফাত ভাই। শায়খে গুনই প্রচারবিমুখ একজন নীরব সাধক ছিলেন। উচ্চপর্যায়ের আল্লাহঅলা বুযুর্গছিলেন। কুতবুল আলম মাদানী রহ.-এর সহবতপ্রাপ্ত মহান এই সাধক পুরুষের সান্নিধ্যে দুইবার কিছু সময় অতিবাহিত করার সুযোগ হয়েছিলো আমার। ইন্তেকালের বছরদুয়েক আগে তিনি (মেয়ের জামাই) মুফতি অবদুল আউয়াল উয়াইসী প্রতিষ্ঠিত জামিয়া মাদানীয়া মান্ডা, মনখার বাড়ী মাদরাসায় কয়েকদিন অবস্থান করেন। তখন উয়াইসী সাহেক আমাকে তার মাদরাসায় দাওয়াত দিয়েছিলেন। এই সফরেই হযরত শায়খে গুনইর সান্নিধ্যে কিছু সময় অতিবাহিত করার সুযোগ হয়েছিলো। সেদিনকার তার চেহারা ও জিহবার বিশেষ অবস্থাই জানান দিচ্ছিলো যে, তিনি নিঃসন্দেহে একজন ছাহেবে নিছবত আল্লাহঅলা, একজন পীরে কামেল রাহবারে তরিকাত।

লেখক:  সম্পাদক, সিলেটরিপোর্ট ডটকম, সদস্য, সিলেট অনলাইন প্রেসক্লাব

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ