প্রচ্ছদ মনীষী জীবন, স্লাইডার

স্মরণীয়-বরণীয়

আত্মত্যাগী কর্মবীর সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন রহ.

আবদুল মাজেদ আতহারী | শনিবার, ৩০ জুলাই ২০১৬ | পড়া হয়েছে 2387 বার

আত্মত্যাগী কর্মবীর সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন রহ.

মাওলানা সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন রহ. | জন্ম: ১৯০৬ মুত্যু: ৩০.০৭.১৯৮৯

হযরত শাহজালাল রহ.-এর সিপাহসালারখ্যাত সৈয়দ নাসিরুদ্দীন রহ.-এর রক্তধারার উত্তরপুরুষ ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামী আন্দোলনের এক সময়ের সঞ্জীবনী শক্তি মাওলানা সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন রহ.-কে কালের তাগিদে খুবই প্রয়োজন বলে মনে হয়। কারণ, এই স্মরণীয় মনীষী যেমন ছিলেন তার কর্মময় জীবনে শিক্ষা বিস্তারে মহানব্রতী, সমাজ সংস্কারে অগ্রনকিব, মজলুম মানবতার পরম বন্ধু, জাতীয় দুর্দিনের সাহসী কাণ্ডারি, ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠায় স্বপ্নবিভোর এক অদম্য দূরন্ত পথিক ও অতুলনীয় সংগঠক।

বহুমুখী প্রতীভার এক জীবন্ত প্রতীক মাওলান সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন যার কর্মবহুল জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রই আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। শিক্ষার ক্ষেত্রে দুর্বলতা ও অরাজকতা প্রত্যক্ষ হলেই মনে পড়ে এই অগ্রপথিককে। মজলুম মানবতার আহাজারী শুনলেই স্মরণ হয় দরদী এই মনিষীর কথা, জাতীয় বিপর্যয়ে কাণ্ডারিবিহীন ডুবন্ত তরীর উতাল-পাতাল দৃশ্য দেখলে স্মৃতির আয়নায় ভেসে উঠে সৈয়দ মুসলেহুদ্দীনের হাস্যোজ্জল প্রত্যয় দীপ্ত মুখচ্ছবি। রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে, রাষ্টীয় সেক্টরে সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি ও দলবাজীর বিভীষিকার মহড়া যখন অসহ্যকর বিরক্তি উৎপাদন করে, তখনই অবারিত অন্তরের এই মনিষীর কথাই বারবার মনে পড়ে।

ঐতিহ্যের পরশে বীরত্বগাঁথা দুঃসাহসী জননেতা মাওলানা সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন ছিলেন আল্লাহর এই জমিনে তার দীন প্রতিষ্ঠার বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে জমিয়তে ওলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির সাংগঠনিক প্রাণপুরুষ। আধ্যাত্মিক রাহবার, জ্ঞানতাপস, যশস্বী মুহাদ্দিস দেশ বিখ্যাত হয়বতনগর আনোয়ারুল উলূম আলিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল এবং ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠের ইমাম হওয়া সত্ত্বেও পঙ্গপালের মত ছুটে বেড়িয়েছেন সারাদেশে তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠকের মত। নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব অসামান্য কর্মীবান্ধব এই নেতা পান রাঙা ঠোঁটের হাসির ঝলক ছড়িয়ে বিমুগ্ধ করে রাখতেন পার্টির সর্বস্তরের নেতা-কর্মীকে, মাছের জীবনের জন্য যেমন অপরিহার্য পানির ছোঁয়া, তেমনই সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন রহ.-এর জীবন অনুষঙ্গ ছিল পার্টির কর্মব্যস্ততা। কথায় কথায় নিজস্ব প্রতিভায় স্বরচিত উর্দূ-ফার্সি কবিতা আবৃত্তি করে মনমাতানো পরিবেশ তৈরির মাধ্যমে নেতা-কর্মীদেরকে আনন্দ উপহার দেয়ার জন্য ছিলেন তিনি পাকা উস্তাদ। যার পরশে নেতা কর্মীগণ থাকতেন সর্বদা প্রাণবন্ত।

উপমহাদেশে মুসলমানদের জন্য পৃথক আবাস ভূমি তথা স্বতন্ত্র স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির আন্দোলনে যারা অগ্রণি ভূমিকা পালন করে স্বাধীনতা লাভের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দান করেছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম কাণ্ডারি সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন । স্বাধীনতা উত্তর মুসলিম লীগ সরকারের তদানিন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে বারবার প্রতিবাদ মুখর হয়ে গণআন্দোলন গড়ে তোলা। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনের স্বপক্ষে জনমত সৃষ্টি করা, চুয়ান্ন সালের ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট গঠন এবং মুসলিম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অভূত পূর্ব বিজয় অর্জন, পরবর্তী আইউব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে গণতান্ত্রিক ধারায় প্রত্যাবর্তনে যৌক্তিক ভূমিকা পালন, ঐতিহাসিক ২২ দফা শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনসহ সর্বোপরি ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি নিয়ে সারা জীবন রাজপথ কাঁপানো নেতৃত্ব দিয়ে কোটি হৃদয়ে যার স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করে গেছেন তিনি সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন রহ.।

দেশের অগ্রগতির ক্ষেত্রে, জাতীয় রাজনীতিতে আন্তদলীয় সমন্বয় সাধনে, ইসলামবিরোধী অপতৎপরতা প্রতিরোধে, ইসলামের অগ্রযাত্রার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দানে পার্টির নেতা-কর্মীদেরকে দূরদর্শী সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় সম্মোহনী নেতৃত্বের মাধ্যমে সুসংগঠিত করে রাজপথে গতিশীল করার মত আর একজন সৈয়দ মুসলেহুদ্দীনের জন্ম হয়নি বলেই স্বপ্নমাখা মাতৃভূমির আজকের এই বিপর্যস্ত অবস্থান।

রাজনীতির বিশাল পরিমণ্ডলে আজ খুঁজে পাওয়া ভার তার মত আত্মত্যাগী নিঃস্বার্থ নেতৃত্ব, পরমত সহিঞ্চু উদার-চিত্তের আদর্শবান ব্যক্তিত্ব, জনতার আস্থাভাজন বিশ্বস্ত দক্ষ কাণ্ডারি, দেশ-জাতি, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও ইসলামের অতন্দ্র প্রহরী, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আজকের মত দুর্দিনে স্বকীয় চেতনাধারী একজন আলোকিত নেতা, এ অভাব জনিত কষাঘাতে যখনই মানসিকভাবে আহত হই তখনই স্মৃতির আয়নায় ভেসে উঠে ত্যাগের বহ্নি শিখা, কালজয়ী রাজনীতিবিদ মাওলানা সৈয়দ মুসলেহুদ্দীনকে রহ.।

আত্মভোলা, ঘর ছাড়া, সংসার উদাসীন এই কর্মবীর পার্টির স্বার্থেই নিজ হাতে গড়া হয়বতনগর আলিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব অকুণ্ঠ চিত্তে ছেড়ে দিয়ে পার্টির হাল ধরে ছিলেন দক্ষ নাবিকের মত। ১৯৫০, ৫২, ৫৩ ঈসায়ী সালে পরপর তিনবার এই দুঃসাহসী নেতাই সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে অসামান্য প্রতিকূল পরিবেশে নিজ বাড়ি মাছিহাতা ও হয়বতনগরে পার্টির সম্মেলন অনুষ্ঠান করেন। যার দৃষ্টান্ত বিরলই বলা যায়। আর কোন নেতার পক্ষে এ ধরণের ঝুঁকি নেয়ার উদাহরণ নেই। পদের মোহ, অর্থ লোভের মত নোংরা ও অশুভ কোনো স্বভাবের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না মাওলানা সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন রহ.।

ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে, সাংগঠনিক জীবনে নিরলস পথ চলেছেন আজীবন নিঃকোচ চিত্তে। সে আত্মত্যাগের বদৌলতেই নেজামে ইসলাম পার্টির সোনালি ইতিহাস, যার বিস্তারিত বিবরণ এই ক্ষুদ্র কলেবরে উপস্থাপন অসম্ভব। উপমহাদেশে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের গোড়াপত্তনকারী সংগঠন নেজামে ইসলাম পার্টি মাওলানা সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন রহ.-এর মত যোগ্য কাণ্ডারির নেতৃত্বের বদৌলতেই সর্বস্তরের জনতার মাঝে এক সময় নিজের অবস্থান সৃষ্টি করে জনগণের রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছিল। যে ঐতিহ্যের ইতিহাস এখনো অম্লান। বরেণ্য জননেতা সৈয়দ মুসলেহুদ্দীনের মত যোগ্য, আদর্শে নিষ্ঠা, আত্মত্যাগী কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অভাবেই তার রেখে যাওয়া সংগঠন নেজামে ইসলাম পার্টি বারবার ভাঙাগড়ার পাল্লায় পড়ে পথচলার শক্তির হারিয়ে এখন একান্তই কাহিল। যার প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ হলেই পুরো অস্থিত্বজুড়ে হতাশার কালো মেঘ ছায়া বিস্তার করে। সে কাহিনি বলার ফুরসত নেই আর।

আমাদের পরম শ্রদ্ধার পাত্র চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব, ইসলামী আন্দোলনের সিপাহসালার, রাজপথ ও সংগ্রামে জনতার সে নেতা সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন রহ.-কে আর আমাদের মাঝে ফিরায়ে পাবো না। তিনি এখন জান্নাতবাসী। স্রষ্টার সমীপে কায়মনো বাক্যে বিশেষ আর্জি—তিনি যেন আমাদের বর্তমান নেতৃত্ব শূন্যতার এই সময়ে আর একজন সৈয়দ মুসলেহুদ্দীন রহ.-মত যোগ্য ও ত্যাগী নেতার আবির্ভাব ঘটিয়ে ইসলামী আন্দোলন ও উম্মাহকে কাঙ্ক্ষিত মনজিলে পৌঁছিয়ে দেন। আমীন!

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষক ফেডারেশন

qaominews.com/কওমীনিউজ/এম

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ