প্রচ্ছদ কলাম, স্লাইডার

রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণে আলেম সমাজের অবদান

উবায়দুর রহমান খান নদভী | বুধবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৭ | পড়া হয়েছে 734 বার

রোহিঙ্গা সংকট উত্তরণে আলেম সমাজের অবদান

সীমান্তে শরণার্থী সংকট এখন জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ত্রাণ কার্যে আর্মি যুক্ত হওয়ায় মানুষ খুশি। শুরু থেকে কাজ করে আসা আলেম সমাজও স্বস্তি পেয়েছেন। জাতির আস্থাভাজন ও প্রিয় সংস্থা সেনাবাহিনী নামায় সারাদেশের ইমাম ও আলেমগণ শুকরিয়া আদায় করছেন। কারণ তারা ময়দানে কাজ করতে গিয়ে বহু সমস্যা আঁচ করছিলেন। রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, কিছু খারাপ লোক মজলুম রোহিংগাদের অসহায়ত্বের সুযোগে নানা দুষ্কর্ম শুরু করে দিয়েছিল। কেউ সামান্য টাকা খাবার ওষুধ ইত্যাদির বিনিময়ে নারীদের নাক কান গলার বেঁচে যাওয়া অলংকার নিয়ে যাচ্ছিল। লাখ টাকার সোনার বালা পাঁচ হাজারে, বিশ হাজারের কানের দুল এক হাজারে কেনার ধুম পড়ে গিয়েছিল। আতংক বিরাজ করছিল শিশু ও নারী পাচারকারীদের হামলার। বেশি সময় পেলে মানুষের অংগ প্রত্যংগের ব্যবসায়ীরাও সক্রিয় হতো। কিছু ত্রাণ বিতরণকারী পর্দাশীলা নারীদের ছাউনির বাইরে এসে ত্রাণ নিতে বাধ্য করছিল । বিপন্ন রোহিংগাদের অনেক সামানপত্র কোনো কোনো নেতার বাড়ি থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে। দালাল ও প্রতারক গ্রেফতার করা হয়েছিল শ দুয়েক। ত্রাণের টাকা ও দ্রব্য লুটপাট হওয়ার আশংকা করছিলো মানুষ। আর্মি ত্রাণ তৎপরতার দায়িত্ব নেওয়ায় স্বস্তি নেমে এসেছে। তারা প্রথমদিন পরিস্থিতি রেকি করার সাথে সাথে ষাট ভাগ বিশৃংখলা কমে যায়। কাজে নামার পর তা সত্তুর ভাগে এসেছে। আলেম ইমাম ও মাদরাসা শিক্ষার্থীরা সেনাবাহিনীর সহযোগী হয়ে দ্বিগুণ উৎসাহে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের প্রকৃত ও বহু পরীক্ষিত দেশপ্রেমিক সৎ নিষ্ঠাবান শক্তির এই মানবিকতার সংগ্রাম সফল হবেই। আল্লাহর রহমত ও ক্ষমা এ দেশকে সকল শত্রুর শ্যেনদৃষ্টি থেকে রক্ষা করবে। মজলুমদের সেবার শক্তিই আলাদা।

সেনাবাহিনী যাওয়ার আগে পরের অবস্থা আর পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন মোবাইলে জানাতে থাকেন উখিয়া টেকনাফে অবস্থানরত আলেমদল। ২৪.০৯.২০১৭ সন্ধ্যার পর থেকে রাত ১০ টা পর্যন্ত রাজধানীর বিশিষ্ট উলামা মাশায়েখের একটি মাশওয়ারাবসে। দীন দেশ ও মানবতার সংকট নিয়ে আলোচনা হয়। মোবাইল ফোনে কথা হয় রোহিংগা ক্যাম্পের সাথে। সেখানে কর্মরত দীনি কাজের সমন্বয় গ্রুপের লোকেরা জানান, কক্সবাজারে এখন শুধু আলেমই আলেম। উখিয়া টেকনাফ এলাকা জুড়ে সাদা পোষাক, নূরানী চেহারা, দরদী দৃষ্টি উলামা মাশায়েখ পীর বুযুর্গ মাদরাসার শিক্ষার্থী ধার্মিক তরুন ও দীনদার নাগরিকদের প্রাচুর্য। নিকটবর্তী মহিলা মাদরাসার তরফ থেকে আমাদের নারীরা মজলুম রোহিংগা মা বোনদের সহমর্মিতার জন্য সেখানে আছেন। সেবার নব্বই ভাগ দেশের আলেম সমাজের হাতেই সম্পাদিত হচ্ছে গত প্রায় এক মাস ধরে।আর্মি যুক্ত হওয়ায় আজ সবার মনেই আনন্দ। মোবাইলে কথা বলিয়ে দেন একজন মুহাজিরের সাথে। রোহিংগা ভাষায় তিনি যা বলেন তার অর্থ হলো, ‘আমরা মগ আর্মিদের চেহারা ও আচরণ দেখে এসেছি, এখানে এসে দেখলাম বাংলাদেশী আর্মি। পিশাচ শয়তানের কবল থেকে আমরা যেন এসে পৌঁছেছি ফেরেশতাদের মাঝে। এরাও আর্মি তারাও আর্মি।’ ভাবছি, এ ইসলামেরই দান। স্বাধীন বাংলাদেশ যে মহান আল্লাহর কত বড় নেয়ামত তা আজ পাঁচ লাখ (নতুন পুরনো সব মিলিয়ে দশ বারো লাখ) মজলুম রোহিংগা বুঝতে পারছে। আমরা ষোল কোটি মানুষও সেটি অন্তর দিয়ে বুঝি। ইসলামী অনেক সংগঠনের নেতারা ত্রাণ ও সংহতি শেষে দলবল সহ ঢাকার পথে রওয়ানা হচ্ছিলেন। ২৫.০৯.২০১৭ মজলিসে দাওয়াতুল হকের আমীর আল্লামা মাহমুদুল হাসান তার কাফেলা সহ দুর্গত এলাকায় গেছেন। আর্মির সহায়তায় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় এই কাফেলা কোটি টাকার ত্রাণ সামগ্রি বিলি করবে। হাজার হাজার তাবু পোষাক বোরকা শুকনো খাবারের প্যাকেট ওষুধ স্যালাইন তৈজসপত্র ছাড়াও তাদের ইচ্ছা আছে শতাধিক মসজিদ মকতব ও মাদরাসার কাজ শুরু করার। কিছু ব্যাংকার ব্যবসায়ী শিল্পপতি যাচ্ছেনই আর্মি নামার পর। আগে যারা আলেমগণের মাধ্যমে সহায়তা করেছিলেন, তারা এখন একই আস্থায় আরও বেশি সহায়তা করছেন। আল্লাহর শুকরিয়া বাংলাদেশ তার সচেতন নাগরিকদের সেবা পাচ্ছে তার সংকট দিনে। চিহ্নিত বুদ্ধিজীবী, মানবতাবাদী, প্রগতিশীল লোকজনের নাম নিশানাও দেখা যাচ্ছে না। নেই নারীবাদী ও গলাবাজ নেত্রীরাও। যারা উদ্দেশ্যমূলক ইস্যুতে আসমান জমিন একাকার করে ফেলেন তাদের কাছে হাজার হাজার ধর্ষিতা রোহিংগা নারী কোনো ইস্যু নয়। কেউ সেখানে যাননি। মুসলিম রোহিংগা নারীদের চোখের পানি এসব একচোখ কানা নেত্রীর কাছে কিছুই না। বড় বড় এনজিও সাহায্য সংস্থা মানবাধিকার সংগঠন কোথায় যেন ঘাপটি মেরে আছে। খুব কমই তাদের নড়াচড়া দেখা যায়। আর যারা নিজেরাই সমাজে নিগৃহিত, মিডিয়ায় উপেক্ষিত শুধু নয় বরং নেতিবাচক প্রচারণার শিকার। সেই জনপ্রিয়তম আলেম সমাজ এবার যে ভূমিকা রেখেছে দীন ও ধর্মের, দেশ ও জাতির ইতিহাসে তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

হেফাজতে ইসলাম রাজধানীতে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। ইদানিং এতো বড় সমাবেশ আর দেখা যায়নি। মায়ানমার দূতাবাস ঘেরাও ও বিভিন্ন সংস্থায় স্মারকলিপি প্রদানে হেফাজত অনেক বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত করে। এ তৌহিদি জনতার ¯্রােতধারা এখন সীমান্তের ত্রাণ কার্যে প্রাণ সৃষ্টি করেছে। দোহারে ইসলামী আন্দোলনের যুব শাখা বিশাল ঈদ পুনর্মিলনী করে। লাখ যুবকের সমাবেশ। বৃহত্তর ঢাকার ইসলামী শক্তির সম্মিলন। পীর সাহেব চরমোনাই সেক্রেটারী শাহাদত সাহেবের মাধ্যমে গাড়ি পাঠান। আমার সেখানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করার কথা। কিন্তু অসুস্থতার জন্য যাওয়া হয়নি। তারা রোগশয্যায় আমার খোঁজ খবর নেন। এই যুব সমাজ এখন রোহিংগা সংকটের কার্যকর কর্মশক্তি। পরের সপ্তাহে গাজীপুর রাজবাড়ী মাঠে ঢাকার উত্তর জেলা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ দক্ষিণ, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও মানিকগঞ্জ থেকে প্রায় তিন লাখ আলেম উলামা পীর মাশায়েখ ইমাম ও ধর্মপ্রাণ মানুষ রোহিংগাদের প্রতি সমবেদনা ও সংহতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত করে। অঞ্চলের বর্ষীয়ান আলেম মাওলানা আশেকে মুস্তফার সভাপতিত্বে এ সম্মেলনে এমন কোনো দল সংগঠন দরবার মসজিদ মাদরাসা নেই যারা শরীক হননি।কথা ছিল কিছুটা সুস্থ বোধ করলে আমি যাবো। অনুষ্ঠানের দিন বার বার উদ্যোক্তারা ফোন করলেও একশ চার ডিগ্রি জ্বর থাকায় আমার যাওয়া হয়নি। উদ্যোক্তা এক বন্ধু দুপুরে বললেন, গাজীপুরের প্রশাসন আমাদের সহযোগিতা করছে। সমবেত আলেম সমাজ আপনাকে খুব মিস করছে। আমাদের কাছে সুযোগ আছে, একটু কষ্ট করে আপনি হেলিকপ্টারে করে দশ মিনিটের জন্য হলেও মঞ্চে আসুন। আপনি বললেই আপনাকে নেওয়ার ব্যবস্থা করবো। আমি বললাম, ভাই আমার অবস্থা উঠে দাঁড়াবার মতোও নয়। আপনারা সম্মেলন শেষ করে ফেলুন। আল্লাহ চাইলে পরে একসাথে কাজ করবো। এই বিশাল ও সম্মিলিত ধর্মীয় কমিউনিটি এখন দিল খুলে ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের আস্থা ভালোবাসা ও বিশ্বাস সাথে নিয়ে রোহিংগা শিবিরে রাতদিন কাজ করে চলেছে। দল মত প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে সবাই খুব ঘনিষ্ট ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত। অতীত যুগের ওলি আওলিয়াদের নিঃস্বার্থ পন্থায় উদারপন্থী সমন্বয়বাদী দীনি কন্টাক্ট গ্রুপ তাদের ঘিরেই কাজ করছে।

রাজধানীর অভিজাত এলাকার এক বড় মসজিদের ইমাম ফোন করে বললেন তাদের ত্রাণ তৎপরতার কথা। কুটনৈতিক জোনের বিখ্যাত মসজিদের খতিব জানালেন তাদের টিম যাচ্ছে কক্সবাজার। এর আগে তাদের মুসল্লিদল কোটি কোটি টাকার খাদ্য পানীয় ওষুধ তৈজষপত্র তাবু বিছানা জামাকাপড় বোরকা নগদ অর্থ বিতরণ করেছেন। ঢাকা দক্ষিণের বহু ইমাম খতিব জানিয়েছেন তাদের ত্রাণ তৎপরতার কথা। জবাবে বলেছি, আলহামদুলিল্লাহ দেশের আলেম উলামা পীর মাশায়েখ ও ধর্মপ্রাণ মানুষ যে ভূমিকা রাখছেন তাতে বাংলাদেশ এ মুহূর্তে সফল।

গত দু সপ্তাহে দুয়েকটি ছাড়া দেশের এমন কোনো বড় ইসলামিক সংগঠন দল ও প্রতিষ্ঠান নেই যার দায়িত্বশীলগণের সাথে আমাদের কথা না হয়েছে। স্বাস্থ্যগত সমস্যায় বিছানা বন্দী ছিলাম বলে অনেকে দেখতে এসেছেন। উভয় পক্ষের কষ্ট হবে বলে অনেককে আসতে দেইনি। অনেকে ফোনে রোগমুক্তির দোয়া করেছেন। মাসনুন দোয় পড়ে দম করেছেন। এ সময়ই সারা দেশের আলেম সমাজ রোহিংগাদের দুর্দিনে কঠিন বিচলিত হন। প্রবাসী আলেমরা খোঁজ খবর জানতে চেয়েছেন। আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী কথা বলেছেন। মাওলানা কাসেমী ফোন করেছেন। বেফাক নেতৃবৃন্দ ও দাওয়াতুল হকের আমীর সাহেব বহুবার কথা বলেছেন। হেফাজতে ইসলাম, ইসলামী আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট, খেলাফত মজলিস প্রভৃতি সংগঠনের নেতৃবর্গ শলা পরামর্শ করেছেন। খেলাফত আন্দোলনের আমীর শাহ আতাউল্লাহ্ হাফেজ্জী দেখতে চলে এসেছেন। এরপর বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি সাময়িক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে পর্যন্ত ভর্তি হন। একটু সুস্থ হয়েই আবার প্রেসক্লাবে সেমিনার ডেকেছেন। এক কথায় রোহিংগাদের কষ্ট গোটা বাংলাদেশকে স্পর্শ করেছে। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত ঈমানদার মানুষ দুঃখ বেদনায় ক্ষোভে যন্ত্রনায় যেমন কাতর হয়ে উঠেছে তেমনি তারা নিন্দা ও প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে। এক কথায় জাতীয় দুর্যোগ ও রোহিংগা সংকটে গোটা বাংলাদেশ তার ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের সঙ্গী হয়ে নজির বিহীন আন্দোলিত হয়েছে। ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বাস্তব ক্ষেত্রে যারা মাঠে ময়দানে জাতির সংকটে দেশের বিপদে মানবতার দুর্দিনে এরাই পরীক্ষায় ফুল মার্ক পেয়ে থাকেন। লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ , গবেষক, সহকারী সম্পাদক দৈনিক ইনকিলাব

qaominews.com/কওমীনিউজ/এইচ

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ