প্রচ্ছদ মনীষী জীবন, স্লাইডার

মুফতি আমিনীর স্মরণে মাওলানা নেজামীর দুটি কথা

মোঃ আবদুল লতিফ নেজামী | মঙ্গলবার, ২৭ ডিসেম্বর ২০১৬ | পড়া হয়েছে 1888 বার

মুফতি আমিনীর স্মরণে মাওলানা নেজামীর দুটি কথা

ইসলামী ঐক্যজোটের সাবেক চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. ও বর্তমান চেয়ারম্যান মাওলানা আবদুল লতিফ নেজামী

পৃথিবীতে অনেক মেধাবী ও প্রতিভাবান ব্যক্তির আগমন ঘটে, কিন্তু সর্বস্তরের মানুষের মণিকোঠায় স্থায়ী স্থান দখল করে নেয়ার ক্ষমতা অনেকেরই থাকেনা। ঐসকল ব্যক্তিগণের ইন্তেকালের পর পরই তাদের কথা বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যায়। আবার দেখা যায় আনেকেই সহজাত গুণাবলীর দ্বারা সর্বশ্রেণীর মানুষের মনে স্থায়ী আসন দখল করে নেন। মরহুম মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. এই শেষোক্ত শ্রেণীর একজন ব্যক্তিত্ব।

ইন্তেকাল মানবজীবনের এক অবধারিত সত্য যা নিঃসন্দেহে বেনাদায়ক। ইন্তেকাল আমাদের কাঁদায় ও শোক সাগরে ভাসায়। এটা যে শুন্যতার সৃষ্টি করে, তা পূরণ হবার নয়। তবে কোন কোন মৃত্যু কারো কারো বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের গৌরবময় কীর্তির আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তিনি তো আমাদের মধ্যেই আছেন আমাদের চেতনায় আলোর দিশারী হয়ে । মুফতি আমিনী এমন এক ব্যক্তিত্ব যার ইন্তেকাল তাঁর গুনগ্রাহী, শুভানুধ্যায়ী ও সহকর্মীদের কাঁদিয়েছে, ব্যথিত করেছে। আর শোকাহত করেছে তৌহিদী জগতাকে। তাঁর শুন্যতা পূরণ হবার নয়। তাঁর না ফেরার দেশে যাওয়া আমাদের চেতনাকে নাড়া দিয়েছে।

২০১২খ্রিঃ সনের ১২ ডিসেম্বর লোকান্তরিত হন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.। তাঁর ইন্তেকালে ইসলামী আন্দোলনের প্রবাহমান গতি পথে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে বলে আমার ধারণা। এতে যুগ সৃষ্টিকারী স্নায়ূতে রক্ত সঞ্চালনকারী ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের পথ নির্দেশক হারিয়ে গেছে । তাই আমরা অভিভাবকহারা, মর্মাহত। পরিণত বয়সে বিদায় নিলেও বেদনা-অপার, বিষন্নতায় আমাদের হৃদয় ভারাক্রান্ত।

আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমেই মরহুম মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ.’র সাথে আমার পরিচয়। বিভিন্ন সংগঠনের মাধ্যমে তাঁর সাথে আমার সম্পর্ক ক্রমশঃ বাড়তে থাকে । তিনি ১৯৯৭ সালে ইসলামী ঐক্যজোটে যোগ দিলে তাঁর সাথে আমার সম্পৃক্ততা আরো গভীর হয় । তাঁর ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তাঁকে যা দেখেছি, তাতে আমার এই বিশ্বাস জন্মেছে যে, কর্তব্যনিষ্ঠা তাঁর সহজাত ছিল।

মুফতি আমিনী ছিলেন আপন মহিমায় ব্যতিক্রমী বিস্ময়ে এক উজ্জ্বল চরিত্র। ইসলামী আন্দোলনের সিঁড়ি তোলাই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অক্ষুন্ন ছিল মুফতি আমিনীর প্রাণচাঞ্চল্য।

মুফতি আমিনী রহ.’র নিজস্ব স্টাইলে চলাফেরা, তাঁর ব্যক্তি চরিত্রের সম্মোহনী শক্তি সকলের জন্যে উদাহরণ হয়ে থাকবে। ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে তিনি যে যাত্রাপথ উদ্বোধন করেছিলেন। সেই যাত্রাপথে হেটে গেছেন আমৃত্যু আপন গতিতে। ইসলামী আন্দোলনের বিবেকী সৈনিক মুফতি আমিনী হারিয়ে গেছেন চিরতরে। কিন্তু তিনি যে অবদান রেখে গেছেন। যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করে গেছেন, তা চির অম্লান থাকবে। তাই মুফতি আমিনীর ইন্তেকাল আমাদের জন্য দারুণভাবে বেদনার।

বিদ্যানুরাগী মুফতি ফজলুল হক আমিনী তাঁর নিজের লেখাপড়ার ক্ষেত্রে স্থাপন করে গেছেন এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভের পর ঘরে বসে পড়াশোনা করা ছিল তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি। প্রচুর কিতাবের সম্ভার তাঁর ঘরে, বৈঠকখানায়। শেষ বয়সেও তাঁর পাঠ্যভ্যাসের আগ্রহে ভাটা পড়েনি। তিনি প্রচুর পড়াশোনা করতেন।

মুফতি আমিনী শুধু শিক্ষকতার মধ্যেই আবদ্ধ না থেকে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্বস্তরে, রাজনীতিতে, ওয়াজ-নসিহতে ও লেখালেখিতে। শাইখুল ইসলাম হযরত আতহার আলী রহ.’র প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ছাত্রসমাজের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতির অঙ্গনে মুফতি ফজলুল হক আমিনীর পদচারণা শুরু। পরে সম্পৃক্ত হয়েছেন খেলাফত আন্দোলনের সাথে। গড়ে তুলেছেন ইসলাম বিরোধী প্রতিরোধ মোর্চা সংক্ষেপে ইসলামী মোর্চা, বর্তমানে খেলাফতে ইসলামী। যোগ দিয়েছেন ইসলামী ঐক্যজোটে । চার দলীয় জোট গঠনে অবদান রেখেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটি। মুফতি আমিনী কর্মসূচী ভিত্তিক ঐক্য গড়ে তোলার লক্ষ্যে সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ, বাবরী মসজিদ লংমার্চ কমিটি , মাদরাসা কল্যাণ পরিষদ, জমিয়তুল আনসারসহ আরো অনেক সংগঠন গড়ে তুলেছেন। এসব অরাজনৈতিক সংগঠনে সমমনা প্রায় সকল রাজনেতিক দল সম্পৃক্ত হয়েছে। এভাবে তিনি কর্মসূচী ভিত্তিক ইসলামী ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়াস চালিয়ে গেছেন।

নানা চাপের মূখেও অত্যন্ত স্বাধীনচেতা দৃঢ় ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মুফতি আমিনীর পরিবর্তন হয়নি। তাকে টলাতে পারেনি তার স্থির লক্ষমাত্রা থেকে। তাঁর বিবেক ও চেতনা ছিল অত্যন্ত শাণিত। তিনি চলতেন প্রত্যয় ও সাহসিকতার দীপশিখা নিয়ে। তাঁর প্রতিটি বক্তব্য ছিল সুস্পষ্ট।

আজীবন সংগ্রামী মুফতি আমিনীর রেখে যাওয়া সৈনিকরা যদি গেয়ে যায় তাঁর জয়গান। তবে আগামী দিনগুলোতে ইসলামী আন্দোলনে তাঁর অবদানের সুর বেজে উঠবে। এভাবেই মুফতি আমিনী বেঁচে থাকবেন শ্রদ্ধা, ভালবাসা আর আন্তরিকতায়।

                                                                                                                                                      লেখক: চেয়ারম্যান, ইসলামী ঐক্যজোট

qaominews.com/কওমীনিউজ/এএন

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ