প্রচ্ছদ কলাম, স্লাইডার

ঈদ বিষয়ে কওমীনিউজ সম্পাদকের বিশেষ নিবন্ধ

বাংলাদেশে ঈদ

আ. ক. ম আশরাফুল হক | শুক্রবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ | পড়া হয়েছে 503 বার

বাংলাদেশে ঈদ

ঈদ একটি নির্মল আনন্দ উৎসব। উচ্ছৃঙ্খলতার প্রশ্রয় যেখানে নেই। কুসংস্কারমুক্ত মননশীল ও বর্ণবৈষম্যহীন উৎসব হচ্ছে ঈদ। ঈদ আমাদের জীবনে বছরে দুবার আসে। প্রথমত দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মনকে পুত-পবিত্রকরণের মধ্য দিয়ে আসে ঈদুল ফিতর। দ্বিতীয়ত সত্যের জন্য যেকোন ধরনের ত্যাগ-তিতিক্ষার ডাক নিয়ে আসে ঈদুল আযজা বা কোরবানির ঈদ।

ঈদ সবার জন্যই বয়ে নিয়ে আসে আনন্দ ও খুশি। সমতা ও উদারতার উৎসব ঈদ। যাতে ছোট-বড়, সাদা-কালো, ধনী-গরিব, রাজা-প্রজার কোন ভেদাভেদ নেই। সবাই তাতে সমভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে। বাংলাদেশে অনেক উৎসবই আছে তন্মধ্যে ঈদ উৎসবই সর্ববৃহৎ। যার তাৎপর্য এ দেশের সংস্কৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঈদ যে কেবলই উৎসব নয়, বরং তা বাংলাদেশি সংস্কৃতির অন্যতম নিদর্শন। ঈদ বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে করেছে অনন্য ও সমৃদ্ধ। করেছে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত। কেননা, ঈদ সমগ্র মুসলিমবিশ্বে একইসঙ্গে একইভাবে উদযাপিত হয়।

ঈদ আসার প্রায় মাসখানেক পূর্ব থেকে চলে ঈদ পালনের পূর্বপ্রস্তুতি। দুটি ঈদে দেখা দেয় দুটি ভিন্ন দৃশ্য, ভিন্ন চিত্র ও ভিন্ন আমেজ। কিন্তু তারপরও ঈদ দুটিতেই দেখা যায় মর্মবাণী ও প্রতিবাদ্য বিষয়ে এক অপূর্ব অভিন্নতা, যা সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণকে করে নিশ্চিত। জন্ম দেয় সাম্য ও মৈত্রীর। ঈদ আসার অনেক পূর্ব থেকে এ দেশের মানুষ পরিকল্পনা নেয় ঈদ উদযাপনের। মনের কম্পিউটারে ঈদ উদযাপনের ডিজাইন করে নেয় বেশ যত্ন করেই। তাই মাসখানেক পূর্ব থেকেই শুরু হয় ঈদের আয়োজন। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সমস্ত শহর-বন্দর এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের হাট-বাজার ও মার্কেগুলো পরিগ্রহ করে নতুন রূপ। প্রতিটি মার্কেট, প্রতিটি দোকান ঈদ উপলক্ষে করা হয় আলোকোজ্জ্বল ও সুসজ্জিত। নিজের জন্য, প্রিয়জনের জন্য এবং আত্মীয়-স্বজনদের জন্য শুরু হয় কেরাকাটা। ঈদ উদযাপনের আয়োজন বা কেনাকাটার এতই ধুম পড়ে যে, মার্কেটগুলোর সামনে যানজট ও মানবজটে ঢাকা শহর ঈদের প্রায় ১৫ দিন আগে থেকে অচল হওয়ার উপক্রম হয়।

অন্যদিকে, ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদের সময় পরিলক্ষিত হয় ভিন্ন এক মনোরম দৃশ্য। প্রতিটি জনবসতিতেই অস্থায়ীভাবে বসে গরু-ছাগলের হাট। সামর্থবান সবাই পছন্দমত কোরবানির পশু কেনার চেষ্টা করেন। শহুরে কোটিপতির ছেলেও কিছু সময়ের জন্য গরুর রশিতে ধরে গ্রাম রাখালের কর্মানুভূতি উপলব্ধি করে।

অতঃপর শুরু হয় ঈদের মূলপর্ব। সকালে ফজরের নামাযের পরপরই প্রস্তুতি, নতুন জামা-পায়জামা পরিধান করে এবং সুগন্ধি ব্যবহার করে ঈদগাহের দিকে রওনা। গাঁয়ের আঁকাবাঁকা, সরু ও প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে দূরে খালি মাঠের দিকে প্রায় একই ধরনের পোশাক পরিহিত মানুষের ঢল যেন এক স্বর্গীয় শোভাযাত্রা। সকাল ৮-৯টায় শুরু হয় সালাতুল ঈদ বা ঈদের নামায। এ এক অপূর্ব মনোরম দৃশ্য। খোলা আকাশের নিচে খালি মাঠে আবাল-বৃদ্ধ সারিবদ্ধভাবে অবস্থান গ্রহণ করে। দুরাকাত সালাত আদায় এবং মঙ্গল ও শান্তি কামনা করে আল্লাহ তায়ালার কাছ মোনাজাত ও প্রার্থনা।


সংস্কৃতি যদি হয় বাস্তবে রীতি-পদ্ধতির চিত্র। সংস্কৃতি যদি হয় দেশের জনগণের জীবনের ছবি।
সংস্কৃতি যদি হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকজনের কৃষ্টির রূপ, তাহলে বলতে হয়—
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ঈদের অবস্থান এক নম্বরে।


শহর-নগর ও গ্রামে একই সময়ে একইসঙ্গে  একই দৃশ্যের অবতারণা গোটা দেশকে আচ্ছন্ন করে এক অপরূপ পুত-পবিত্র ও স্বর্গীয় আমেজে। যাতে নেই কোন অপবিত্রতার স্পর্শ, কুসংস্কারের ছোঁয়া। পরিচ্ছন্ন এক আনন্দ উৎসব ঈদ, যা আনন্দের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মন থেকে পাপ-পঙ্কিলতা ও হিংসা-বিদ্বেষ বিদূরিত করে।

ঈদ

প্রায় সকল জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকা ঈদ উপলক্ষে প্রকাশ করে বিশেষসংখ্যা। রেডিও-টিভি আয়োজন করে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভবনে দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও বিদেশি কূটনীতিকবিদদের জানানো হয় ঈদ শুভেচ্ছা। জেলখানাগুলোতে পরিবেশন করা হয় উন্নত খাবার। রাজধানীর প্রধান প্রধান সড়কে ও ভবনে কালিমা তৈয়বা খচিত পতাকা লাগানো হয়। ঈদে গ্রামবাংলায় নানাধরনের পিঠা তৈরির ধুম পড়ে। পাড়া-প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকে ঈদ আপ্যায়ন এবং তাদের ওখানেও ঈদের দাওয়াতে অংশগ্রহণ— জন্ম দেয় সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহমর্মিতাপূর্ণ এক অনন্য পরিবেশ।

সংস্কৃতি যদি হয় বাস্তবে রীতি-পদ্ধতির চিত্র। সংস্কৃতি যদি হয় দেশের জনগণের জীবনের ছবি। সংস্কৃতি যদি হয় সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকজনের কৃষ্টির রূপ, তাহলে বলতে হয়— বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে ঈদের অবস্থান এক নম্বরে। কেননা, এতেই কেবল সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে থাকে। দেশে আরো অনেক উৎসবই হয়, তবে সেগুলোতে রাজনৈতিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বর্ণবৈষম্যের কারণে সর্বস্তরের মানুষের পক্ষে অংশগ্রহণ সম্ভব হয় না। কিন্তু ঈদ উদযাপনে কোন বৈষম্যই বাদ সাধতে পারে না, মানুষের আনন্দ-উৎসাহে চিড় ধরাতে পারে না। ঈদ সবধরনের বৈষম্যের কলে মূল উৎপাটন এবং কায়েম করে সাম্য  ও সম্প্রীতি। সুতরাং রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলার র‌্যালি বের করা এবং পৌত্তলিকদের উপাস্য বিভিন্ন জীবজন্তুর র‌্যালি বের করা বাংলাদেশের সংস্কৃতি হতে পারে না। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার যে, বেশ কয়েক বছর ধরে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিজাতীয় অশ্লীল ও কুসংস্কারপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী ব্যাপকহারে পরিলক্ষিত হচ্ছে। রেডিও-টিভিতে ঈদ উপলক্ষে প্রচারিত অনুষ্ঠানমালা হচ্ছে ঈদের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ, যা বাংলাদেশের মননশীল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র হিসাবে বিবেচিত।

অতএব, ঈদ উপলক্ষে দেশের বেতার ও টিভিতে প্রচারিত অনুষ্ঠানাদি ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ঈদের সঙ্গে এবং এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বিশ্বাস ও জীবন রীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হবে— এটাই বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা।

লেখক: সম্পাদক, কওমীনিউজ ডটকম

qaominews.com/কওমীনিউজ/এম

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ