প্রচ্ছদ মনীষী জীবন, স্লাইডার

ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ.

মুফতি মোহাম্মদ এনামুল হাসান | শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ | পড়া হয়েছে 2309 বার

ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ.

ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ.

আলেম উলামাগণ হলেন নবীগনদের ওয়ারিশ বা প্রতিনিধি। সে ধারাবাহিতায় আলেম উলামাগণ যুগে যুগে মানবজাতির কাছে ইসলামের সুমহান আদর্শ ও সঠিক মর্মবাণী প্রচার প্রসারে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। পথহারা মানবজাতিকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনতে দিয়েছেন সঠিক দিকনির্দেশনা। বস্তুত আলেম উলামাদের সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার কারণেই মানবজাতি আজ ইসলামী আদর্শে আদর্শবান।

আমাদের পাক-ভারত উপমহাদেশে ইসলাম প্রচার প্রসারে যে সকল আলেম উলামা অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে ব্রাক্ষণবাড়ীয়ার কৃতিসন্তান আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ.’র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।  আল্লামা তাজুল ইসলাম ছিলেন দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যতম ইসলামী ব্যাক্তিত্ব, মুফাসসিরে কোরআন, মুহাদ্দিস, শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, জাতীয় আজাদী আন্দোলনের অন্যতম বীর সৈনিক। ইসলামী জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল তার পাণ্ডিত্য। বাংলাদেশে ইসলামী  আদর্শ কৃষ্টি কালচার শিক্ষা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তিনি যে উজ্জলময় অবদান রেখে গেছেন তা সত্যিই এ দেশের ইসলাম প্রিয়  জনতার জন্য অত্যন্ত গৌরবের বিষয়। বহুমুখী প্রতিভা,মেধা ও কৃতিত্বের জন্য আল্লামা তাজুল ইসলাম ফখরে বাঙ্গাল উপাধিতে ভূষিত হন।

জন্ম: ব্রাক্ষণবাড়ীয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার ভূবন গ্রামে ১৩১৫ হিজরী মোতাবেক ১৮৯৬ খৃষ্টাব্দ।  পিতা মাওলানা আনোয়ার আলী রহ., যিনি সমকালীন যুগে একজন প্রসিদ্ধ আলেম ছিলেন।

শিক্ষাজীবন: পিতা মাওলানা আনোয়ার আলী পুত্রের বয়ষ যখন ৮ কিংবা ৯ বছর তখন তিনি তাকে স্থানীয় স্কুলে ভর্তি করেন। স্কুলে ভর্তি হওয়ার মাত্র ৯ মাসে বালক তাজুল ইসলাম ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত সকল ক্লাসের পাঠ্যবিষয় মুখস্থ করে ফেলে। স্কুল জীবন শেষে বালক তাজুল ইসলাম স্থানীয় জেঠাগ্রামে মাওলানা আব্দুল করীম এর নিকট প্রাথমিক কিতাবাদি অধ্যায়ন করেন। পরে তিনি শ্রীঘর মাদরাসায়  ভর্তি হন। শ্রীঘর মাদরাসার পর হবিগঞ্জ জেলার বাহুবল মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখান থেকে অতি সুনামের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে সিলেট আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। ১৩৩৭-৩৮ হিজরীতে সিলেট আলিয়া মাদরাসার সর্বশেষ পরীক্ষায় তিনি প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। ১৩৩৮ হিজরীতে আল্লামা তাজুল ইসলাম বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হন। দারুল উলূম দেওবন্দে ৪বছরে তিনি উচ্চ পর্যায়ে হাদীস, তাফসীর, ফিকহ, আক্বায়েদ ও আরবী সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। দেওবন্দে শিক্ষাজীবনে প্রতিটি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে তিনি উত্তীর্ণ হন।

দেওবন্দ মাদরাসায় তাজুল ইসলাম রহ.’র প্রধান পৃষ্টপোষক ও শিক্ষক ছিলেন সমকালীন বিশ্বের শীর্ষ  মুহাদ্দেস আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশমিরী রহ. শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী রহ., শাইখুল আদব মাওলানা এজাজ আলী রহ. ও মুফতী  আজিজুর রহমান রহ.।

কর্মজীবন: ১৩৪২ হিজরীতে দেওবন্দ থেকে ফিরে এসে  আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ. সর্ব প্রথম ঢাকা এবং পরে কুমিল্লা জামিয়া মিল্লিয়ায় শাইখুল হাদিস হিসেবে যোগদান করেন। ১৩৪৫ হিজরীতে ব্রাক্ষণবাড়ীয়ার ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইসলামীয়া ইউনুসিয়া মাদরাসায় প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন। ইন্তেকালের পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত  দীর্ঘ ৪২ বছর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন যুগে ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম  রহ.’  সমসাময়িক যাদের সাথে এবং যাদেরকে নিয়ে  ইসলামের কাজ করেছেন তারা হলেন শাইখুল ইসলাম হযরত মাওলানা আতহার আলী রহ.,  খতীবে আযম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ রহ., মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিন রহ., মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব পীরজী হুজুর রহ., বাংলার কালোমানিক মাওলানা আশরাফ আলী ধরমন্ডলী রহ.,  মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরীরহ., মাওলানা মোহাম্মদ উল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ.,  মাওলানা ছফি উল্লাহ চাদপুরী রহ. ও  মাওলানা সিরাজুল ইসলাম বড় হুজুর রহ.  তাদের অন্যতম।

রাজনীতি: ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ.  ছিলেন শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনীতিবিদ। এ দেশের মানুষ যখন হতাশাগ্রস্থ হয়ে তাদের চারিত্রিক অধঃ পতনের কারণে সঠিক পথ ভুলে গিয়ে ইসলামী তাহজিব তামাদ্দুনকে বিসর্জন দিয়ে বৃটিশদের কৃষ্টি কালচারের প্রতি ঝুকে গিয়েছিল তখন পথভ্রষ্ট জাতিকে সঠিক পথের সন্ধান দিতে তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ছিল সর্বাপেক্ষা বেশী।

দেওবন্দে অধ্যায়নকালে বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে স্বীয় উস্তায শাইখুল ইসলাম হযরত শাব্বির আহমদ ওসমানী রহ.’র একান্ত সহচর হিসেবে কাজ করেছেন ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ.। ফখরে বাঙ্গাল রহ. ছিলেন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বাংলাদেশের অগ্রগামী নেতা। বৃটিশ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর এদেশ আবারও যাতে কোন অমুসলিম সম্প্রদায়ের হাতে না যায়, এব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন তিনি। তাই বৃটিশদের সাথে হিন্দুদের আতাত দেখে মুসলমানদের স্বাধীনতা নিয়ে যখন ভারতবর্ষের মুসলিম নেতারা আতঙ্কিত ও সন্দিহান হয়ে উঠলেন, তখন তিনিও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। শাইখুল ইসলাম হযরত উসমানী রহ. শেরে বাংলা একে ফজলুল হক, শাইখুল ইসলাম মাওলানা আতহার আলী রহ., হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, হযরত যাফর আহমদ ওসমানী রহ. আল্লামা আজাদ সোবহানী রহ. আল্লামা সোলাইমান নদভী রহ. মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দিন রহ. ও ফুরফুরা, শর্সিনার তখনাকার পাীর সাহেবগনসহ ভারতবর্ষের সকল মুসলিম নেতৃবৃন্দের সঙ্গে ফখরে বাঙ্গাল রহ.ও মুসলমানদের জন্য স্বতন্ত্র আবাসভূমি কায়েম তথা পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। সেদিন ১৯৪৭ সনে মুসলমানদের জন্য পৃথক দেশ পাকিস্তান হয়েছিল বলেই আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি।

ফখরে বাঙ্গাল রহ., ১৯৪৫ সনে কলকাতা মোহাম্মদ আলী পার্কে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম প্রতিষ্ঠাতাদেরও অন্যতম একজন। ১৯৫০ সনে ১৮, ১৯ ও ২০ ফেব্রুয়ারি ৩দিনব্যাপি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের ঐতিহাসিক ’মাসিহাতা কনফারেন্সে’ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। ফখরে বাঙ্গাল ও মালানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দীন রহ.’র উস্তাযে মুকাররম শাইখুল ইসলাম হযরত শাব্বির আহমদ উসমানী রহ.’র নামে ঐতিহাসিক মাছিহাতায় ‘শাব্বির ময়দান’ নামে মাঠের নাম করণ করে সেখানে সেই কনফারেন্স করা হয়। সিলেটের ঐতিহাসিক রেফারন্ডমেও তিনি ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখেন। যার দরুন সিলেট আজ স্বাধীন বাংলাদেশের অংশ। সেদিন ফখরে বাঙ্গালের খালেছ দ্বীনের মুজাহিদরা যদি সিলেটের প্রতিটি গ্রামে-গঞ্জে মুসলিম জাতি স্বত্ত্বাবোধ ও স্বতন্ত্র আবাস ভূমির বিষয়ে গণ আন্দোল সৃষ্টি না করতেন, তাহলে সিলেট আজও হিন্দু ভারতের দখলে থাকতো। সেখানকার মুসলমানরা আজও অমুসলিমদের দ্বারা নির্যাতিত-নিপীড়িত হতো। সিলেট আরেকটি কাশ্মীর, আরাকান হতো। সিলেটের মুসলমানরা আজও পরাধীন থেকে যেতো। কনফারেন্সে অন্যান্য শীর্ষ আলেমদের সাথে তিনিও নিখিল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় নেতা নির্বাচিত হন। দেশের সকল শ্রেণীর মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্যে যা ১৯৫২ সনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম নাম ধারণ করে। ফখরে বাঙ্গাল রহ. পরবর্তিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও নেজামে ইসলাম পার্টির সহ সভাপতি এবং তৎকালীন কুমিল্লা জেলা সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৪ সনের ঐতিহাসিক সংসদ নির্বাচনে নেজামে ইসলাম পার্টির মনোনীত ঐতিহাসিক ’হক-আতহার-ভাষানী’  তথা যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসাবে বর্তমান ব্রাক্ষণবাড়ীয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলা ও সারাইলের কিছুঅংশ নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসনে তিনি অংশগ্রহণ করেন। সামান্য ব্যবধানে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হতে না পারলেও তার দল নেজামে ইসলাম পার্টি প্রাদেশিক পরিষদে ৩৬টি আসন লাভ করে এবং কেন্দ্রে পায় ৪টি আসন। যা এখনো পর্যন্ত ভারতবর্ষে কোন ইসলামী দলের সর্বোচ্চ সংসদীয় আসন লাভের রেকর্ড।

ফখরে বাঙ্গাল উপাধি: আলামা তাজুল ইসলাম রহ.  দেওবন্দ মাদরাসায় শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যায়ে কাদিয়ানীদের বিরুদ্ধে এক বাহাস (তর্কযুদ্ধ)  অনুষ্ঠিত হয়। তিনি কোরআন ও হাদিসের আলোকে তথ্যভিত্তিক দলিল এবং অকাট্য যুক্তির দ্বারা কাদিয়ানীদেরকে কাফের প্রমাণ করার পর উপস্থিত জনতা তাকে ফখরে বাঙ্গাল বা বাংলার গৌরব উপাধিতে ভূষিত করেন।

বিশ্ব উলামা সম্মেলনে যোগদান: ১৯৬৪ সালে পুর্বেকার মাজহাব সমুহ ও আয়েম্মায়ে মুজতাহিদীনের পরিবর্তে নতুন মাজহাব ও মুজতাহিদীন গঠন করা প্রসঙ্গে মিশরের রাজধানী কায়রোতে বিশ্ব উলামা সম্মেলনে তৎকালীন পুর্ব পাকিস্থান হতে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে নতুন মাজহাব এবং মুজতাহিদীন নির্বাচনের প্রস্তাবে যুক্তির মাধ্যমে প্রবল বিরুধিতা করেন। তার তথ্যভিত্তিক ও যুক্তির মাধ্যমে নতুন মাজহাব গঠনের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায়। ফখরে বাঙ্গাল রহ.)  কায়রোতে বিশ্ব উলামা সম্মেলনে পুর্ব পাকিস্তান থেকে একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগদিয়ে বিশ্বের দরবারে এ দেশের এবং দেশের জনগণের ভাবমুর্তি উজ্জ্বল করেন। উক্ত সম্মেলনে তিনি ফখরুল উলামা বা উলামাদের গৌরব ও হাফিজুল হাদিস উপাধিতে ভূষিত হন।

বিবাহ ও পারিবারিক জীবন: ফখরে বাঙ্গাল তাজুল ইসলাম পাঁচ ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন। তিনি উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ কেরাত বিশেষজ্ঞ ও বাংলণাদেশে ইলমে কেরাতের প্রবর্তক উজানীর কারী ইবরাহিম সাহেবের তৃতীয় কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। এ স্ত্রী থেকে তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার বড় ছেলের নাম ছিল আব্দুল্লাহ। তিনি মজ্জুব প্রকৃতির লোক ছিলেন। দ্বিতীয় ছেলের নাম হাফেজ হাবিবুল্লাহ। প্রথম স্ত্রীর ইন্তেকালের পর তিনি সরাইল থানার দেওরা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে দ্বিতীয় বিবাহ করেন। এ স্ত্রীর থেকে দুই ছেলে ও এক মেয়ে জন্ম গ্রহণ করে। প্রথম ছেলের নাম হাফেজ ইমদাদুল্লাহ আর দ্বিতীয় ছেলের নাম হাফেজ ওয়ালি উল্লাহ। মেয়ের নাম নাসিমা খাতুন।

ইন্তেকাল: ফখরে বাঙ্গাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রহ. ১৯৬৭ সালের ৩ রা এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭১ বৎসর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

তিনি ছিলেন এক বর্নাট্য জীবনের অধিকারী, সারাটি জীবন দ্বীনের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি ছিলেন মুসলিম সমাজের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাক্তিত্ব। তার বর্নাঢ্য জীবনটাই ছিল ইসলামের এক ইতিহাস।
                                                               

                                                               লেখক: শিক্ষক, জামিয়া কোরআনিয়া সৈয়দা সৈয়দুন্নেছা

কারিগরি শিক্ষালয়, ব্রাক্ষণবাড়ীয়া।

qaominews.com/কওমীনিউজ/এএন

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ