প্রচ্ছদ মনীষী জীবন, স্লাইডার

কালো মানিক মাওলানা আশরাফ আলী ধরমন্ডলী রহ.

আ.ক.ম আশরাফুল হক | শনিবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৭ | পড়া হয়েছে 2231 বার

কালো মানিক মাওলানা আশরাফ আলী ধরমন্ডলী রহ.

বাংলার কালো মানিক মাওলানা আশরাফ আলী ধরমন্ডলী রহ.

গত শতাব্দীতে যে কয়জন অসাধারণ মনীষী এদশেে রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামী জীবন ব্যবস্হা কায়মেরে পাশাপাশি বক্তৃতার মাধ্যমে ইসলামকে একটি কালজয়ী জীবন দর্শন রুপে উপস্হাপন করছেনে, মাওলানা আশলাফ আলী ধরমন্ডলী রহ. তাদরে অন্যতম একজন।

সাবকে জাতীয় পরষিদ সদস্য (এম,এন,এ) বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ, আলমেে দ্বীন ও বাগ্নি এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ একাধারে বহু প্রতিভাধারী ছিলেন। ছিলেন একজন লব্ধ প্রতিষ্ঠিত মুহাদ্দিস ও মুফাসসিরে কোরআন এবং প্রসিদ্ধ হাক্কানী পীরে কামেল। প্রখর মেধা ও সুক্ষ্ম রাজনৈতিক বুৎপত্তি সম্পন্ন কমপ্লিট পলিটিশিয়ান হিসাবে তার ব্যাপক খ্যাতি ছিল। ছিলেন আকাবিরে দেওবন্দের উজ্জ্বল নক্ষত্র।

দারুল উলূম দেওবন্দের অত্যন্ত মেধাবী ও কৃতি ছাত্র ছিলেন মাওলানা আশরাফ আলী ধরমন্ডলী রহ.। তারিখে দারুল উলূম দেওবন্দের বর্তমান বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ তিন জন আলেমের অন্যতম একজন তিনি। শাইখুল ইসলাম হযরত আতহার আলী রহ. ও মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.-এর পরেই মাওলানা আশরাফ আলী ধরমন্ডলী রহ, বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ ও আলোচিত আলেমের একজন। তিনি বাংলা ভাষায় প্রথম বোখারী শরীফের অনুবাদ করেছেন বলেও দারুল উলূম দেওবন্দের ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

মাওলানা আশরাফ আলী রহ দেখতে বেশ কালো ছিলেন। তবে তার কণ্ঠ সমধুর ও আওয়াজ বেশ বলিষ্ঠ ছিল। তার বক্তৃতা, ওয়াজ অত্যন্ত তথ্যবহুল ও গভীর হতো। এজন্য তাকে বাংলার কালো মানিক ডাকা হতো। বাংলার কালো মানিক মাওলানা আশরাফ আলী ধরমন্ডলী হিসাবেই তিনি অধিক পরিচত ছিলেন। তার জনসমাবেশ ও ওয়াজ মাহফিলে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামতো। দশ বিশ মাইল পায়ে হেটে তার ভাষণ ও ওয়াজ শুনার জন্য মানুষ  চলে আসতো।

কালো মানিক মাওলানা আশরাফ আলী রহ. ১৯২০ সনের ২৩ মার্চ, বাংলা ১৩২৭ ও হিজরী ১৩৪০ সন রোজ বৃহস্পতিবার বর্তমান বি. বাড়ীয়া জেলার নাসিরনগর থানার ধরমন্ডল গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মুনশী ওয়াজিদ আলী। তিনি নিজেদের বাড়ীতে প্রতিষ্ঠিত এবতেদায়ী মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভের পর শায়েস্তাগঞ্জ আলীয়া মাদরাসা ও সিলেট গাছবাড়ী আলীয়া মাদরাসায় অধ্যয়ন করেন। অতপর ১৯৩৮ সনে জামাতে উলা পাশ করে ইসলামী শিক্ষার উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের লক্ষ্যে সুদুর ভারতের উত্তর প্রদেশ গমন করেন। সেখানে বিশ^খ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুল উলূম দেওবন্দ মাদরাসায় একাধাওে কয়েক বছর অধ্যয়ন কওে ১৯৪৫ সন মুতাবেক ১৩৬৪ হিজরীতে দাওরায়ে হাদীস তথা টাইটেল ডিগ্রী অর্জন করেন।

তার উস্তাদদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ্যযোগ্য হলেন, মুফতিয়ে আযম মুহাম্মাদ শফী রহ. শায়খুত তাফসীর মাওলানা ইদ্রিস কান্দালবী রহ. মাওলানা হোসাই আহমদ মাদানী রহ, শায়খুল আদব মাওলানা এজায আলী রহ. প্রমুখ সহ আরো অনেক খ্যাতিমান আলেমগণ।

ইসলামের প্রচার-প্রসার ও বাস্তবায়নই মরহুম মাওলানার জীবনের ব্রত ছিল। তাই তিনি যশোর জেলার মনিরামপুর থানাধীন লাউড়ি সিনিয়র মাদরাসার হেড মাওলানা হিসাবে শিক্ষকতা দিয়ে কর্ম জীবন শুরু করেন। অতপর মাওলানা সৈয়দ মুসলেহ উদ্দীন রহ.-এর বিশেষ আগ্রহে ১৯৫১ সনে কিশেরগঞ্জের ঐতিহাসিক হয়বতনগর আনওয়ারুল উলূম কামিল মাদরাসার মুহাদ্দিস পদে যোগ দেন এবং সেখানে বোখারী, মুসলিম, নাসায়ী শরীফ ও তাফসীরে কাশশাফের মত কিতাবাদি অত্যন্ত সুনামের সহিত বহুদিন অধ্যাপনায় রত থাকেন।

হয়বত নগর মাদরাসায় হাদীসের দরস দিতে এসেই কালো মানিক মাওলানা আশরাফ আলী রহ, উপমহাদেশের ইসলামী রাজনীতির দুই অগ্নি পুরুষ শাইখুল ইসলাম হযরত আতহার আতহার আলী রহ. ও সৈয়দ মাওলানা মুসলেহ উদ্দীন রহ.-এর সান্নিধ্যে আসার সুযোগ পান। আর তাতেই তিনি জীবনের আরেক অধ্যায় শুরু করেন। বস্তুত, এই দুই মহাপুরুষের সান্নিধ্যই তার জীবনে গতি সৃষ্টি করে। ফলে শুধু শিক্ষা ক্ষেত্রে ইসলামকে সীমিত না রেখে জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলাম কায়েমের সর্বাত্মক প্রয়াসই তার জীবনের চরম লক্ষ হয়ে দাড়ঁয়। আর এ ক্ষেত্রে তার সমগ্র প্রতিভা, মেধা ও শ্রম ব্যয় করে তিনি অতি অল্প সময়েই হয়ে উঠেন দেশের শ্রেষ্ঠ বাগ্নী এবং অন্যতম রাজনীতিবিদ।

জাতীয় রাজনীতিতে ধূমকেতুর মত মাওলানা আশরাফ আলী রহ.-এর আর্বিভাব ঘটে। ১৯৫২ সনে ঐতিহাকি হয়বতনগরে অনুষ্ঠিত ‘জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম’ তথা ‘নেজামে ইসলাম পার্টি’ র জাতীয় কাউন্সিলে গঠিত নির্বাহী কমিটির সহকারী সেক্রেটারী জেনারেল হিসাবে তার রাজনৈতিক জীবনের অভিষেক হয়। অতপর ‘৫৫’ ও ’৫৮’ –এর কাউন্সিলে ধারাবাহিকভাবে পার্টির সংগঠন সচিব এবং ৬৫’ সনে সেক্রেটারী জেনারেল নির্বাচিত হন। স্বাধীনতা উত্তরকালে ৯০’ দশক থেকে নিয়ে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি উপমহাদেশের প্রাচীনত এই পার্টির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫২ থেকে ৫৪’ পর্যন্ত তার অগ্নিঝরা বক্তৃতা ও ব্যাপক সাংগঠনিক তৎপরতায় ৫৪’-এর সাধারণ নির্বাচনে ’হক-আতহার-ভাসানী’-এর যুক্তফ্রন্টের নমিনেশন বাছাই ও নির্বাচন পরিচালনার স্টিয়ারিং কমিটির অন্যতম সদস্য মনোনীত হন। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং ফ্রন্টের অন্যতম শরিক দল ’নেজামে ইসলাম পার্টি’র পক্ষ থেকে প্রাদেশিক পরিষদে ৩৬ এবং জাতীয় পরিষদে ৪ টি আসন লাভের পিছনে তার জ্বালাময়ী ব্ক্তৃতা ও সাংগঠনিক ভূমিকার যথেষ্ট অবদান ছিল। ঐতিহাসিক ওই নির্বাচনের পর শাইখুল ইসলাম হযরত আতহার আলী রহ.-এর নেতৃত্বে বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বজন সমাদৃত ঐতিহাসিক ’ইসলামী সংবিধান’ প্রণয়নে নীতিনির্ধারক হিসাবে মাওলাানা আশরাফ আলী রহ.’র অবদানও অবিষ্মরণীয়।

আইয়ূব খানের সামরিক শাসন, মৌলিক গণতন্ত্র, পারিবারিক আইন ও ড. ফজলুর রহমান, আহমদ শরীফ, তসলিমা নাসরিন ও কাদিয়ানীদের ইসলামবিরোধী কর্মকা-সহ যাবতীয় ইসলাম বিরোধিতা ও অপশাসনের প্রতিরোধে মাওলানা আশরাফ আলী রহ. গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। নীতি ও আদর্শেও প্রতি ছিলেন অবিচল এবং সর্বদাই ছিলেন ঐক্যে বিশ্বাসী ও প্রয়াসী। তাই স্বাধীনতা উত্তরকালে দেশে ইসলামী রাজনীতিতে বিভিন্ন দল, উপদল সৃষ্টি হওয়ায় মাওলানা সাহেব বেশ বিচলিত হয়ে পড়েন এবং ৯১’ সনের সাধারণ নির্বাচনের প্রাক্কালে এদের মধ্যে কমপক্ষে নির্বাচনী ঐক্য গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তিনি তীব্রভাবে অনুভব করতে থাকেন। অবশেষে একান্তভাবে তার উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় গঠিত হয় ’ইসলামী ঐক্যজোট’। তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। এছাড়া আরও বহু রজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের গোড়াপত্তনে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

মাওলানা আশরাফ আলী ধরমন্ডলী রহ. শুধু নিজ দেশের ভিতরকার ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থ নিয়েই চিন্তা করেননি; তিনি বরং বিশ্বব্যাপী মুসলিম স্বার্থ নিয়ে সার্বক্ষণিক চিন্তামগ্ন থাকতেন। ফলে যখনই বিশ্বের কোথাও মুসলিম স্বার্থে আঘাত হেনেছে, মুসলমানদের উপর জুলুম হয়েছে, তখনই তিনি এর প্রতিবাদে হয়ে উঠেছেন সোচ্চার। কাশ্মীর, চেচনিয়া, আফগানিস্তান, বার্মা, ফিলিপাইন, ফিলিস্তিন ও আলজেরিয়ায় মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর কর্মসূচীর আন্দোলন করেছেন। ১৯৯০ সনে ইরাকে আমেরিকার অবৈধ হামলা ও পবিত্র ভূমিতে তাদের অনৈতিক পদচারণার প্রতিবাদে তিনি বাংলাদেশস্থ মার্কিন এম্বেসি ঘেরাও কর্মসূচীর নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেন।

দ্বীনের এই মহান খাদেম ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করণে আজীবন প্রচেষ্টা করত ১৯৯৭ সনের ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ রোজ বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টায় দীর্ঘ বার্ধক্যজনিত রোগে বি, বাড়ীয়া শহরস্থ নিজ বাস ভবনে ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মরহুম মাওলানা আশরাফ আলী রহ. কে তার গ্রামের বাড়ীর পারিবারিক গোরস্তানে দাফন করা হয়।

জাতীয় রাজনীতিতে তার অভাব অপুরণীয়। আল্লাহ পাক তার সমগ্র জীবনের চেষ্টা সাধনাকে কবুল করুক। জন্নাতের উচ্চ মাকাম তাকে নসীব করুক। আমিন! লেখক: সম্পাদক, কওমীনিউজ

qaominews.com/কওমীনিউজ/এইচ

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ