প্রচ্ছদ সাহিত্য, স্লাইডার

ইবনে বাত্তূতা’র দেখা বাংলাদেশ

ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন | বুধবার, ২৫ অক্টোবর ২০১৭ | পড়া হয়েছে 1161 বার

ইবনে বাত্তূতা’র দেখা বাংলাদেশ

উত্তর আফ্রিকার প্রখ্যাত পর্যটক ইবন বাত্তূতা’র বাংলাদেশ ভ্রমণ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তিনি প্রায় দু’ মাসব্যাপী অধিকাংশ সময় নদীপথে বাংলার বিভিন্ন স্থান ঘুরে বেড়িয়েছেন। তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্ত ‘রিহলাহ’ চতুর্দশ শতকের বাংলার আর্থ-সামাজিক অবস্থার একটি নির্ভরযোগ্য বিবরণ সরবরাহ করে। তৎকালীন ধর্মীয় অবস্থার রেখাচিত্র এর মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। সে সময়ের বাংলার অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ইবনে বাত্তূতা’র নিজস্ব মন্তব্য রয়েছে এবং তিনি নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্য সামগ্রীর মুল্যের একটি তালিকা সংযোজন করেন তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্তে।

তাঁর বর্ণনায় প্রতীয়মান হয় যে, চতুর্দশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গকে ‘বাঙ্গালা’ বলা হত এবং এ অঞ্চলের অধিবাসীরা ‘বাঙ্গালী’ নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে ‘বাঙলা’ ও ‘বাঙ্গালী’ শব্দ দু’টি এ অঞ্চলের সাথে উত্তর ও পশ্চিম বঙ্গের অধিবাসীদেরে ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হয়। ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ ছিলেন তখন বাংলার সুলতান এবং তাঁর রাজধানী ছিল সোনারগাঁ। তিনি প্রজারঞ্জক শাসক ও অতিথিদের প্রতি অত্যন্ত সদয় ছিলেন বলে ইবনে বাত্তূতা উল্লেখ করেন। ইবনে বাত্তূতা ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দে মালদ্বীপ থেকে ৪৩ দিনে চট্টগ্রামের পথে বাংলায় প্রবেশ করেন।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশের যে শহরে আমরা প্রথম প্রবেশ করি তাঁর নাম ‘সোদকাওয়ান’। এটা সমুদ্রের উপকূলে অবস্থিত একটি বড় শহর। সমুদ্রে মিলিত হওয়ার আগে এই শহরের নিকট গঙ্গা, যেখানে হিন্দুরা তীর্থে গমন করে এবং যমুনা নদী মিলিত হয়েছে।” ধ্বনির দিক বিবেচনা করে কোন কোন গবেষক ‘সোদকাওয়ান’কে সাতগাঁও (ত্রিবেণীর সপ্তগ্রাম) এর সঙ্গে অভিন্ন মনে করলেও মুদ্রাতত্ত্ববিদ ড. নলিনী কান্ত ভট্টশালী ও ড. আবদুল করিমের মত বরেণ্য ইতিহাসবিদগণ ‘সোদকাওয়ান’কে চট্টগ্রাম বলে উল্লেখ করেন। ইবনে বাত্তূতা এখানে কর্ণফুলী নদীকে ভুল করে গঙ্গা বলেছেন বলে অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায় মনে করেন (H.A.R Gibb, Ibn Battuta, p.612; Dr. N. K Bhattasali, Coins and Chronology of Early Independent Sultan of Bengal, pp. 145-149; Dr. Abdul Karim, Social History of the Muslims in Bengal, p. 32; অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (১২০৪-১৫৭৬) পৃ. ১৯৮,৬০৫; ড. এম.এ. রহীম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, প্রথম খন্ড,পৃ.৩)

ইবনে বাত্তুতা বাংলাদেশে এসে প্রথমে চট্টগ্রাম প্রবেশ করেন। চট্টগ্রাম বন্দরে তিনি অনেক সমুদ্রগামী জাহাজ দেখতে পান। তাতে বুঝা যায় যে, চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বানিজ্যের কেন্দ্র ছিল। কিন্তু সাময়িক অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রামে বেশী দিন অবস্থান তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। কারণ ঐ সময় বাংলার সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের সঙ্গে লখনৌতির সুলতান আলী শাহের যুদ্ধ চলছিল। ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি বাংলার সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের সঙ্গে সাক্ষাতের পরিকল্পনা বাদ দেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সোদকাওয়ান’ গিয়েছিলাম- সুলতানকে আমি দেখিনি, তাঁর সাথে আলাপও করিনি, কারণ তিনি ভারতবর্ষের সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন এবং সাক্ষাত করলে ফল কি হবে, সে সম্বন্ধে আমার ভয় ছিল” তিনি একমাত্র হযরত শাহ জালালের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম হতে সিলেট রওনা হন। তাঁর বর্ণনায় শায়খের কৃচ্ছতা, সংযম, নিষ্ঠা ও সেবাধর্মী জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়।

ইবনে বাত্তূতা বর্ণনা করেন যে, “আমি ‘সোদকাওয়ান’ ত্যাগ করে কামরু (কামরূপ) পর্বতমালার দিকে রওনা হলাম। সেখান (সোদকাওয়ান) হতে ঐ জায়গায় পৌঁছতে এক মাস সময় লাগে। কামরু পর্বতমালা বিরাট ও বিস্তীর্ণ, চীন হতে তিব্বত পর্যন্ত প্রসারিত। সেখানে কস্তুরী মৃগ পাওয়া যায়। এ সব পাহাড়ের অধিবাসীদের সঙ্গে তুর্কীদের মিল আছে। তাদের পরিশ্রম করার শক্তি ও সাধ্য অসাধারণ। তাঁদের জাতের একজন ক্রীতদাস অন্য জাতের অনেকজন ক্রীতদাসের সমকক্ষ। যাদু এবং ভোজবাজীতে দক্ষতা ও অনুরাগের জন্য তাঁরা সুপ্রসিদ্ধ। ঐ পর্বতমালাতে আমার যাবার উদ্দেশ্য ছিল একজন দরবেশকে দর্শন করা। আমি যখন আসাম অঞ্চলে প্রবেশ করি দরবেশ তখন স্বজ্ঞালব্ধ জ্ঞানে আগমনবার্তা জানতে পেরে চার জন লোক প্রেরণ করেন আমাকে অভ্যর্থনা জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে। দরবেশের খানকাহ হতে চার দিনের দূরত্বে থাকতেই তাঁরা আমার সঙ্গে সাক্ষাত করে এবং জানায় যে, দরবেশ কর্তৃক তাঁরা প্রেরিত হয়েছেন আমাকে স্বাগত জানাবার জন্য। তাঁদের সমভিব্যাহারে আমি যখন শায়খের সম্মুখে উপস্থিত হই, তিনি দাঁড়িয়ে আমাকে অভ্যর্থনা জানান এবং বুকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি আমার দেশ কোথায় এবং সফরের উদ্দেশ্য কি জানতে চান। অতঃপর তিনি আমাকে সসম্মানে আপ্যায়নের জন্য তাঁদের নির্দেশ দেন। শায়খ আমাকে বলেন-আল্লাহ তাঁকে দয়া করুন- যে খলিফা আল মুসতাসিম বিল্লাহ আল আব্বাসীকে তিনি বাগদাদে দেখেন এবং তাঁর হত্যাকান্ডের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন” (H.A.R Gibb, Ibn Battuta, p.612,613)

ইবনে বাত্তুতা তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে সিলেট অথবা শ্রীহট্ট শব্দ উল্লেখ করেননি। আসাম ও কামরু (কামরূপ) পর্বতমালার কথা বলেছেন, যা চীন ও তিব্বত পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে এটা বাস্তব যে, বর্তমান সিলেটের যে স্থানে শায়খ শাহ জালাল রহ.এর মাযার রয়েছে ইবনে বাত্তূতা সে জায়গাই পরিভ্রমণ করেন।

ইবনে বাত্তূতা’র ভাষ্য মতে এ শায়খ ছিলেন একজন শ্রেষ্ট বুযুর্গ, তাঁর ব্যক্তিত্ব অসাধারণ। তাঁর কেরামত (অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ) এবং মহৎ কর্মগুলি জনসাধারণ্যে সুপরিচিত। অত্যন্ত বয়োবৃদ্ধ এ দরবেশ ছিলেন ক্ষীণদেহ, দীর্ঘকায় ও বিরল শ্মশ্রু। তিনি প্রায় চল্লিশ বছর রোজা রাখেন এবং দশ দিন অন্তর রোজা খুলতেন। তিনি একটি গাভী পালন করতেন এবং একমাত্র এর দুধই ছিল তাঁর খাদ্য। তিনি সারা রাত ইবাদতে মশগুল থাকতেন। এ ফকির প্রতিদিন প্রভাতে মক্কায় তাঁর প্রভাতী নামায সম্পন্ন করতেন এবং দিবসের অবশিষ্ট কাল তিনি পর্বতকন্দরেই অবস্থান করতেন। এতদ্ব্যতীত প্রতিবছর ঈদ উপলক্ষে মক্কায় গমন করতেন। ইবনে বাত্তূতা আরও বলেন, যে, এ শায়খের শ্রমের ফলে ঐ অঞ্চলের অধিবাসীরা ইসলামে দীক্ষিত হন এবং এ জন্য তিনি তাদের মধ্যে বসতি স্থাপন করেন। সেখানের এক পর্বত কন্দরে তিনি ‘খানকাহ’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই খানকাহ ছিল সাধু, দরবেশ, পরিব্রাজক ও দারিদ্র্য পীড়িত মানুষের আশ্রয়স্থল। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা করত এবং তাঁর জন্য খাদ্যদ্রব্যসহ নানা সামগ্রী উপহার আনত। এসব উপহার সামগ্রী দিয়ে তাঁর আস্তানায় বহু লোককে খাওয়ানো হত। তাঁর অনুসারীরা পরবর্তী সময়ে ইবনে বাত্তূতাকে জানান যে, এ দরবেশ একশত পঞ্চাশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন (Ibn Battuta,Text, pp.144-145)। ইবনে বাত্তূতা কর্তৃক বর্ণিত তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় পরবর্তীকালে রচিত লোক-সঙ্গীতে ’সিলেটে লক্ষ লক্ষ হিন্দু ছিল, কিন্তু কোন মুসলমান ছিল না’।

ফখরুদ্দীন মুবারক শাহের রাজ্যের অন্তর্গত ‘হবংক’ ( বর্তমান সিলেট জেলার অন্তর্গত) শহর বাংলার সবচেয়ে সুন্দর ও গৌরবপূর্ণ শহরগুলির অন্যতম। বর্তমানে ‘হবংক’ নামে বৃহত্তর সিলেটে কোন শহর নেই। সম্ভবত এটা পরিবর্তিত হয়ে অন্য নাম ধারণ করেছে। তবে এটা শায়খ শাহজালাল রহ. এর মাযারের অনতিদূরে অবস্থিত। এ নামটি ষ্পষ্টত অহমীয় শব্দ। এ শহরে ইবনে বাত্তুতা হিন্দুদের যে অবস্থা দেখেছিলেন তার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, “হবংকের অধিবাসীরা বিধর্মী (কাফির), তাঁরা ‘যিম্মা’ (রক্ষণ ব্যবস্থা) এর অধীন। যে শস্য তারা উৎপাদন করে, তার অর্ধেক নিয়ে ফেলা হয়। এটা ছাড়াও তাদের অনুরূপ অন্যান্য করও দিতে হয়।” অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায় এ প্রসঙ্গে বলেন, এটা হতে বুঝা যায়, ফখরুদ্দীনের কাছে হিন্দুরা উদার ব্যবহার পায়নি। ড. আর. সি মজুমদারও বলেন, ফখরুদ্দীন কিন্তু হিন্দুদের প্রতি খুব ভাল ব্যবহার করেননি (H.A.R Gibb, Ibn Battuta, p.614-615) অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস (১২০৪-১৫৭৬) পৃ. ১৯৮-১৯৯,৬০৭; ড. রমেশ চন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, মধ্যযুগ, পৃ.৩২৪-৩২৫) এই অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাসের প্রাক্তন প্রফেসর ড. ব্যারিষ্টার মুহাম্মদ মুহর আলী বলেন, “This expressoin of Ibn Battuta’s has been taken by some writers to observe that the lot of Hindu population under Fakhr al-Din ‘was not very enviable’. It should be noted that Ibn Battuta here speaks only about a particular area near Sylhet, a region which was recently conquered by the Muslims. There is no evidence to show that the Hindus throughout Bangala had a similar lot under Fakhr al-Din.”
“ইবনে বাত্তুতা’র উপর্যুক্ত বর্ণনা প্রসঙ্গে কতিপয় লেখক মন্তব্য করেন যে, ফখরুদ্দীনের রাজত্বে হিন্দু জনগোষ্ঠীর ভাগ্য খুব বেশী সুপ্রসন্ন ছিল না। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইবনে বাত্তুতা সিলেটের সন্নিকটে একটি বিশেষ অঞ্চলের ঘটনা উল্লেখ করেছেন, যা সে সময়ে সবেমাত্র মুসলমান দ্বারা বিজিত হয়েছে। ফখরুদ্দীনের আমলে বাঙ্গালার সর্বত্র হিন্দুদের প্রতি অনুরূপ বৈরীভাব পোষণ করা হত, এমন কোন প্রমাণ উপস্থাপন করা যাবে না” (Dr. Muhammad Mohar Ali, History of the Muslims of Bengal, vol. I A, p.129)।

সিলেটে তিন দিন অবস্থান শেষে ইবনে বাত্তূতা নীল নদী অর্থাৎ মেঘনা দিয়ে হবংক হইতে সোনারগাঁও এ আসেন পনের দিনে। নদীপথের ভ্রমণের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন,“নদীর দু’ধারে ডানে ও বামে ছিল বহু জল চালিত চাকা, উদ্যানরাজি ও অসংখ্য গ্রাম, অনেকটা মিশরের নীল নদীপথের মত।……..আমরা পনের দিন ধরে গ্রাম ও উদ্যানরাজির মধ্য দিয়ে নদী পথে চললাম, মনে হয়েছিল যেন আমরা একটি বাজারের ভিতর দিয়ে গমন করছি।” সোনারগাঁ ছিল সুলতান ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের অধীন তৎকালীন বাংলার রাজধানী এবং মুদ্রা তৈয়ারের টাকশাল। রাজধানীর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অতি সুদৃঢ় ছিল বলে ইবনে বাত্তূতা সোনারগাঁকে দুর্ভেদ্য নগরী রূপে উল্লেখ করেন। মুসলমান রাজত্বের প্রথম দিকে সোনারগাঁকে দেখা যায় একটি প্রসিদ্ধ ও সমৃদ্ধশালী শহর ও বন্দর রূপে, যেখানে বৈদেশিক বানিজ্য পোতসমূহ পণ্যদ্রব্যের জন্য আগমন করত। ইবনে বাত্তূতা বলেন, “সোনারগাঁয়ে আগমনের পর আমরা একটি চীন দেশীয় পালতোলা তলদেশ চেপ্টা বানিজ্য জাহাজ দেখতে পেলাম। জাহাজটি জাভা যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল। সোনারগাঁ হইতে জাভার দূরত্ব চল্লিশ দিন”। (H.A.R Gibb, Ibn Battuta, p.615)।

ইবনে বাত্তূতা এর ভ্রমণ কাহিনী হতে জানা যায় যে, সেসময় বাংলাদেশ ইসলাম ধর্ম প্রচারের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে বহু দরবেশ, ফকির ও উলামা বাস করতেন। বাংলাদেশে তখন তাঁদের বেশ প্রতিপত্তি ছিল। বাংলার সুলতান ফখরুদ্দীন মুবারক শাহ ফকির দরবেশদের অত্যন্ত ভক্তি করতেন। সাধারণ জনগণের নিকটও তাঁরা শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। সুফী দরবেশদের নানা প্রকার সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়। নৌকায় যাতায়াত করলে তাঁদের ভাড়া দিতে হতোনা, তাঁদের প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদিও বিনামূল্যে সরবরাহ করা হতো। ফকিরেরা কোন শহরে প্রবেশ করলে অর্ধ দিনার দিয়ে অভ্যর্থনা জানানো হতো (Tarikh-i-Firuzshahi, p.91; কে.এম. রাইছউদ্দিন খান, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিক্রমা, পৃ. ২৭৭)। সুলতান ফখরুদ্দীন এর এত অধিক ফকির-প্রীতি ছিল যে, তিনি ‘শায়েদা’ নামক একজন ফকিরকে চট্টগ্রামে তাঁর প্রতিনিধি নিযুক্ত করে তাঁর কোন এক শত্রুর (সম্ভবত ত্রিপুরার) বিরুদ্বে স্বয়ং যুদ্ধযাত্রা করেন। সুলতানের অনুপস্থিতির সুযোগে ‘শায়েদা’ বিদ্রোহী হয়ে সুলতান ফখরুদ্দীনের একমাত্র পুত্রকে হত্যা করেন। এখানে একটি বিষয় স্মরণ রাখতে হবে যে, সুলতান ফখরুদ্দীনের ঐ নিহত পুত্র ব্যতীত অন্য কোন পুত্র ছিল না; তাঁর উত্তরাধিকারী ইখতিয়ারুদ্দীন গাজী শাহ সম্ভবত তাঁর পালিত পুত্র ছিলেন। কারণ ইখতিয়ারুদ্দীন গাজী শাহ তাঁর মুদ্রায় স্বীয় পিতৃপরিচয় সম্বন্ধে কোন কথাই উল্লেখ করেননি। এ বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে সুলতান ফখরুদ্দীন সত্বর রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেন। বিদ্রোহ দমিত হলে ‘শায়েদা’ তাঁর অনুচরবর্গসহ সোনারগাঁয়ে পলায়ন করেন। সুলতান সোনারগাঁ অবরোধের জন্য সৈন্য প্রেরণ করেন। সোনারগাঁয়ের অধিবাসীগণ প্রাণভয়ে ভীত হয়ে বিদ্রোহী শায়েদা ও তাঁর অনুচরবর্গকে সুলতানের সেনাবাহিনীর হস্তে সমর্পণ করে এবং সুলতানকে সমস্ত সংবাদ নিবেদন করে। সুলতানের আদেশে ফকীর শায়েদার ছিন্নমুণ্ড তার নিকট প্রেরিত হয়। ফকীর শায়েদার বিদ্রোহের ফলে বহু ফকীরকে প্রাণদণ্ড প্রদান করা হয়। ইবনে বাত্তূতার বিবরণ হতে জানা যায় যে, ফখরুদ্দীন সাতগাঁয়ে বা চট্টগ্রামে বিদ্রোহী হন। তাঁর রাজধানী বা শক্তিকেন্দ্র ছিল সোনারগাঁয়ে; কারণ ৭৪০/১৩৪০-৭৫০/১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তাঁর যত মুদ্রার সন্ধান পাওয়া যায় সব সোনারগাঁয়ের মুদ্রাশালায় মুদ্রিত হয়েছিল। ইবনে বাত্তূতা তাঁর ভ্রমণকাহিনীর সর্বত্রই ফখরুদ্দীনকে বঙ্গ বা বাঙ্গালা এর সুলতান বলে উল্লেখ করেন। কখনও লাখনৌতির সুলতান বলে অভিহিত করেননি। ইবনে বাত্তূতা বাঙ্গালা বলতে পূর্ববঙ্গকেই ইঙ্গিত করেছেন এবং এই অঞ্চলের রাজধানী ছিল সোনারগাঁয়ে। ফখরুদ্দীন “সাতগাঁয়ে এবং বাংলায় বিদ্রাহী হয়েছিলেন” এ উক্তি হতে অনুমিত হয় যে, সাতগাঁ স্থায়ীভবে ফখরুদ্দীনের কর্তৃত্বাধীন ছিল না। জিয়াউদ্দীন বারানীও লিখেছেন যে, লাখনৌতির শাসনকর্তাকে পরাজিত করে তিনি সাতগাঁ দখল করেন। অবশ্য তার পূর্বেই তিনি সোনারগাঁয়ে তাঁর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন” (Dr. N. K Bhattasali, Coins and Chronology of Early Independent Sultan of Bengal, pp. 138,184; History of Bengal, Dhaka University, vol.ii,p.102; ড. সুশীলা মন্ডল, বঙ্গদেশের ইতিহাস, মধ্যযুগঃ প্রথম পর্ব,১৮৯-১৯০)।

ইবনে বাত্তূতা বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর যে মন্তব্য করেন, তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ড.রমেশ চন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘মুসলমানদের ধর্মের গোঁড়ামি যেমন হিন্দুদেরকে তাদের প্রতি বিমুখ করেছিল, হিন্দুদের সামাজিক গোঁড়ামিও মুসলমানদেরকে তাদের প্রতি সেরূপ বিমুখ করেছিল। হিন্দুরা মুসলমানদেরকে অস্পৃশ্য, ম্লেচ্ছ, যবন বলে ঘৃণা করত, তাদের সাথে কোন প্রকার সামাজিক বন্ধন রাখত না। গৃহের অভ্যন্তরে তাদের প্রবেশ করতে দিত না, তাদের স্পৃষ্ট কোন জিনিষ ব্যবহার করত না। তৃষ্ণার্ত মুসলমান পথিক জল চাইলে বাসন অপবিত্র হবে বলে হিন্দু তা দেয় না, ইবনে বাত্তূতা এরূপ ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তার সপক্ষে শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে হিন্দুরা যেমন নিজেদের আচরণ সমর্থন করত, মুসলমানরাও তেমনি শাস্ত্রের দোহাই দিয়া মন্দির ও দেবমূর্তি ধ্বংসের সমর্থন করত। বস্তুত উভয় পক্ষের আচরণের মূল কারণ একই যুক্তি ও বিচার নিরপেক্ষ ধর্মান্ধতা কিন্তু ন্যায্য হোক বা অন্যায্য হোক পরস্পরের প্রতি এরূপ আচরণ যে উভয়ের মধ্যে প্রীতির সম্বন্ধ স্থাপনের দুস্তর বাধা সৃষ্টি করেছিল তা অস্বীকার করার উপায় নেই। অনেক দিন যাবত অভ্যস্ত হলে অত্যাচারও গা-সওয়া হয়ে যায়, যেমন সতীদাহ বা অন্যান্য নিষ্টুর প্রথাও হিন্দুর মনে এক সময়ে কোন বিকার আনতে পারত না। হিন্দু-মুসলমানও তেমনি এ সব সত্ত্বেও পাশাপাশি বাস করেছে, কিন্তু দু’ সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃভাব তো দূরের কথা স্থায়ী প্রীতির বন্ধনও প্রকৃতরূপে স্থাপিত হয়নি’ (ড.রমেশ চন্দ্র মজুমদার, বাংলাদেশের ইতিহাস, মধ্যযুগ,পৃ.৩২৪-৩২৫) ।

ইবনে বাত্তূতা পশ্চিমে মরক্কো হইতে সুদূর চীন পর্যন্ত অনেক দেশ ও সমৃদ্ধ অঞ্চল পরিভ্রমণ করেন। তিনি বিখ্যাত নগরী কায়রো, বসরা, শিরাজ, ইস্ফাহান, বুখারা, সমরকন্দ, তিরমিয, বাল্ক, হিরাত, বেইজিং পরিদর্শন করেন, কিন্তু বাংলার মত ধানের প্রাচুর্য এবং জিনিষপত্রের এত স্বল্পমূল্য তিনি আর কোথাও দেখেননি। অবশ্য এ দেশের লোকেরা তাঁকে জানান যে, তখন জিনিষপত্রের দাম অত্যন্ত চড়া ছিল। তিনি তাঁর ভ্রমণ কাহিনীতে নিত্য ব্যবহার্য কিছু দ্রব্যের দাম উল্লেখ করেন। তবে তা বর্তমানে টাকার হিসাবে নির্ণয় করা কঠিন। বিগত কয়েক শ’ বছরে স্বর্ণ ও রৌপ্যের দাম অনেক পরিবর্তিত হয়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, এ কথা আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। তিনি দিল্লীর রৎল বা ওজনের পরিমাপ অনুযায়ী দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করেন। ইউল এবং টমাসের নির্দেশ অনুযায়ী এক রৎলের ওজন প্রায় ২৮.৮ পাউন্ড বা বঙ্গের ওজনের ১৪ সেরের সমান। একটি স্বর্ণ দীনার ছিল ১০টি রৌপ্য দীনারের সমান মূল্যবান এবং একটি রৌপ্য দীনার ছিল আট দিরহামের সমতুল্য অর্থাৎ বর্তমান এক টাকার সমান। এসব দিক বিবেচনা করে প্রফেসর নীরদ ভূষণ রায় ১৯৪৮ সালে ইবনে বাত্তূতা’র সময়ের জিনিষপত্রের দাম তুলনামূলক পর্যালোচনা পূর্বক নির্ধারণ করেন। নিুলিখিত তালিকা হতে চতুর্দশ শতাব্দীর দ্রব্যমূল্যের একটি চিত্র পাওয়া যাবে।

চাল আনুমানিক ৮ মণ (২৫ দিল্লীর রতল) ৭.০০ টাকা
           ধান ” ২৮ ”  ( ৮০  ”   ” ) ৭.০০ টাকা
          ঘি ” ১৪ সের  (  ১   ”     “) ৩.৫০ টাকা
  তিল তৈল ” ১৪ সের (১    ”    ” ) ১.৭৫ টাকা
গোলাপ জল ” ১৪ সের ( ১   ”   ” ) ৭.০০ টাকা
       চিনি ” ১৪ সের ( ১  ”    ” ) ৩.৫০ টাকা
           ৮ টি তাজা মুরগী ০.৮৮ টাকা
            ৮ টি তাজা ভেড়া ০.৭৫ টাকা
         ১ টি দুগ্ধবতী গাভী ২১.০০ টাকা
            ১৫ টি পায়রা ০.৮৮ টাকা
    ১৫ গজ সূক্ষ্ম সুতি কাপড় ১৪.০০ টাকা

মুহাম্মদ আল মাছমূদী নামে একজন মরক্কোবাসী ইবনে বাত্তূতাকে বলেন যে, তাঁর স্ত্রী ও এক ভৃত্যসহ বহুদিন পূর্বে বাংলায় অবস্থান করেন, ইবনে বাত্তূতা দিল্লীতে থাকাকালীন তাঁর মৃত্যু হয়েছে। বাংলায় অবস্থানকালে তাঁদের তিন জনের উপযুক্ত এক বছরের খাদ্য সামগ্রী ক্রয় করতে তাঁর মাত্র ৮.০০ টাকা ব্যয় হত। ইবনে বাত্তূতা আরও জানান যে, সেই সময় সুতী কাপড় ছিল বাংলার অন্যতম রফতানী পণ্য। সোনারগাঁ হতে দিল্লীর সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের দূত হিসাবে চীন যাওয়ার পথে পনের দিন পর তাঁর জাহাজ Barahnakar নামক স্থানে পৌঁছলে তিনি কিছু মুসলিম অধিবাসীর সন্ধান পান, যারা বাঙ্গালা হতে উন্নত সুতী বস্ত্র এনে সেখানে বিক্রয় করে। র্যা লফ ফিচ ও চৈনিক পরিব্রাজক মাহুয়ান (Ma-Huan) এর বর্ণনায় ইবনে বাত্তূতা এর উপরিউক্ত মন্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। মাহুয়ান ১৪২৫ সালে বাংলাদেশ পরিভ্রমণ করতে গিয়ে ছয় ধরনের অতি উন্নত ও সুক্ষ্ম সুতী বস্ত্র দেখে অভিভূত হন এবং মন্তব্য করেন যে, ৩ ফুট প্রস্থ ও ৫৭ ফুট দৈর্ঘ এসব বস্ত্র খন্ড এত সুন্দর ও ঝকমকে যে, যেন চিত্রাংকিত ÔIt is as fine and as glossy as if painted’ মাহুয়ান এর ১৬১ বছর পর ১৫৮৬ সালে বাংলায় আসেন পরিব্রাজক র্যা লফ ফিচ। তিনি লিখেছেন, এখান (সোনারগাঁ) হতে প্রচুর পরিমানে সুতীবস্ত্র বিদেশে যায় এবং প্রচুল চাল সমগ্র ভারত, সিংহল, পেগু, মালাক্কা, সুমাত্রা এবং অন্যান্য স্থানে প্রেরিত হয় (H.A.R Gibb, Ibn Battuta, p.610, 616; Yule`s Cathay and the way Thither, p.439; Thomas, Chronicles of Pathan Kings, p. 22; Dr. N. K Bhattasali, Coins and Chronology of Early Independent Sultan of Bengal, pp. 144; Dr. Muhammad Mohar Ali, History of the Muslims of Bengal, vol. I B, p.938) ।

ইবনে বাত্তূতা বাংলার গ্রামীণ জনপদের নৈসর্গিক রূপ মাধুর্য, শ্যামল শোভা ও ফল শোভিত বৃক্ষরাজি হৃদয় মন দিয়ে উপভোগ করেন। নদী বক্ষ ও তটপ্রান্ত হতে নগর জীবন অপেক্ষা পল্লী বাংলার জীবনধারাকে অধিকতর উপলব্দি করার সুযোগ পান। প্রধানত জলপথেই দেশের বানিজ্য চলাচল হত এবং নদীগুলিতে নৌযান শ্রেণীবদ্ধভাবে চলত। ইবনে বাত্তূতা বলেন, “বঙ্গদেশের নদীতে অসংখ্য নৌকা চলাচল করে। প্রত্যেক নৌকায় একটি করে ডংকা থাকে। যখন নৌকাগুলো পরস্পর অতিক্রম করে তখন ঐ সকল নৌকা হইতে ডংকাধ্বনি করা হয়-পরস্পর সম্মান বিনিময় হয়। সম্ভবত জলদস্যুতা নিবারণের জন্য এ রূপ ব্যবস্থা ছিল” (H.A.R Gibb, Ibn Battuta, p.271)।

মুসলমান আমলে বাংলাদেশে দাস প্রথার ব্যাপক প্রচলন ছিল। চতুর্দশ শতকে ইবনে বাত্তূতা যখন বাংলাদেশ পরিভ্রমণে আসেন তখন তিনি বাজারে দাস-দাসী ক্রয় বিক্রয় হতে দেখেন। তিনি লিখেছেন,“উপ পত্মীরূপে সেবা কর্মের উপযুক্ত একটি সুন্দরী যুবতীকে এক স্বর্ণ দিনারে আমার সম্মুখে বিক্রয় করা হয়। একটি স্বর্ণ দিনার মরক্কোর স্বর্ণ দিনারের ২.৫০ দিনারের সমান। আমি ‘আশুরা’ নাম্নী একটি যুবতী দাসীকে প্রায় একই মূল্যে ক্রয় করি। দাসীটি অসাধারণ সুন্দরী ছিল। আমার সঙ্গীদের একজন এক স্বর্ণ দিনারে ‘লুলু’ নামে একটি ছোট সুন্দর ক্রীতদাস ক্রয় করেন” ((H.A.R Gibb, Ibn Battuta, p.610)।

মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য ও খাদ্য দ্রব্যের প্রাচুর্যের জন্য বিদেশীরা বাংলাদেশকে খুব পছন্দ করলেও তাঁরা এই দেশের আবহাওয়া মোটেই সহ্য করতে পারতনা। বর্ষাকালে পানি বাহিত রোগ ব্যাধিতে বহু মানুষ আক্রান্ত হয়ে পড়ত। তাই খুরাসানবাসীরা ইবনে বাত্তূতার নিকট বাংলাদেশকে অভিহিত করেন ‘দোযখ পুর আয নিয়ামত’ বা ধন ঐশ্বর্যে পরিপূর্ণ এক নরক (A hell crammed with blessings) রূপে অভিহিত করেন। পরবর্তী বহু ঘটনায় ইবনে বাত্তূতা এর উপর্যুক্ত মন্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। উত্তর ভারতের অধিবাসীরা বাংলার জলবায়ু ও বৃষ্টিপাত ভীতির চোখে দেখত এবং তাঁরা বাংলাতে চাকুরি এড়িয়ে চলত। এমনকি সম্রাট আকবরের রাজত্বের প্রথম দিকে দ্বিগুন বেতন প্রদান করলেও মুঘল সেনারা বাংলায় চাকুরি করতে পছন্দ করতনা (Dr. Muhammad Mohar Ali, History of the Muslims of Bengal, vol. I A, p.129; History of Bengal, Dhaka University, vol.ii, p.102; H.A.R Gibb, Ibn Battuta, p.615; আকবরনামা, ১ম খন্ড, পৃ. ১৩৩)।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ইবনে বাত্তুতা এর ভ্রমণ বৃত্তান্ত কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্ব-বিরোধী ও অসঙ্গতিপূর্ণ। তিনি সিলেটের শাহজালালকে ভুল বশত শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিজী বলায় পাঠক-গবেষকগণ হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন। অথচ আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, তাঁরা দু’জন ভিন্ন ভিন্ন দরবেশ। সিলেটের শাহ জালাল রহ. এর মৃত্যুর একশ’ বছর পূর্বে সম্ভবত ১২৪৪ সালে শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিজী রহ. ইন্তেকাল করেন। এক বর্ণনা মতে ভারতীয় উত্তর বঙ্গের অধীন পান্ডুয়ার নিকটস্থ দেবকোটের দেওতলায় তঙ্গা নদীর পার্শ্বে তাঁর মাযার রয়েছে। সেখানে তাঁর স্মৃতিসৌধ ও লঙ্গরখানা এখনও বিদ্যমান। সিলেটের শাহ জালাল রহ. এর দরগাহে প্রাপ্ত হোসেন শাহ আমলের ৯১৮হিজরী/১৫১৫ খ্রিষ্টাব্দের তারিখযুক্ত এক শিলালিপিতে শায়খ জালাল মুজাররাদ বিন মুহাম্মদ নাম উল্লেখ রয়েছে। একই রাজত্বকালে উৎকীর্ণ ৯১১ হিজরী/১৫০৫ খ্রিষ্টাব্দের অন্য একটি শিলালিপিতে শায়খ জালাল মুজাররাদ কুনিয়াভী অর্থাৎ ‘কুনিয়ার দরবেশ জালাল’ নামে উল্লেখ করা হয়েছে। মুজাররাদ অর্থ অবিবাহিত আর কুনিয়া তুরস্কের একটি এলাকার নাম। ইবনে বাত্তূতা প্রায় ছ’ বছর দিল্লীতে থাকাকালীন বহু সূফী দরবেশের সান্নিধ্য লাভ করেন। ঐ সময় তিনি শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিজী এর নাম শোনেন এবং চীন যাওয়ার পথে জনসাধারণ্যে শাহ জালাল নামে পরিচিত শায়খ জালাল এর সাথে সাক্ষাত করেন। চীন ও এশিয়ার বহুস্থান ও নগরী পরিভ্রমণ শেষে তিনি মরক্কো প্রত্যাবর্তন করেন। শাহ জালাল রহ. এর সাক্ষাতের পঁচিশ বছর পর তিনি তাঁর ভ্রমণ বৃত্তান্ত নথিবদ্ধ করেন। ভ্রমণ বৃত্তান্ত তিনি নিজে লিখেননি; বরং ফেজের রাজদরবারে স্মৃতির পাতা হতে এগুলো বর্ণনা করেন। মুহাম্মদ ইবনে জাওযী নামক একজন রাজসচিব কর্তৃক তা লিখিত হয়। বিশ বছর পূর্বে দেখা ব্যক্তি ও ঘটনা স্মৃতিবিভ্রাটের কারণে ভুল হওয়া স্বাভাবিক। এই ধরনের বিভ্রাটে পতিত হয়ে ইবনে বাত্তুতা শাহ জালাল রহ. এর নামের সহিত আল তাবরিজী জুড়ে দিয়েছিলেন। অসঙ্গতি সমূহ বাদ দিলে ইবনে বাত্তুতা এর ভ্রমণ কাহিনী বাংলার জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তাঁর বর্ণিত তথ্য বিবরণী পরবর্তী পর্যায়ে বাংলায় আসা পর্যটক ও ইতিহাসবিদগণ সত্য বলে দৃঢ় অভিমত ব্যক্ত করেন। (Dr.Ahmad Hasan Dani, Inscriptions in Bengal, pp.7, 15. 58 ; ড. এম.এ. রহীম, বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, প্রথম খন্ড,পৃ.৭৮-৭৯, ৮৪-৮৭)। লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ, ইতিহাবিদ ও গবেষক।

qaominews.com/কওমীনিউজ/এইচ

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

আর্কাইভ